
ভেজাল ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধের কারণে দেশে লাখো মানুষ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে। যৌনশক্তিবর্ধক, ভিটামিন ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের নামে বিক্রি হওয়া মানহীন ওষুধে হৃদরোগ, লিভার ও কিডনি সমস্যা এমনকি ক্যান্সারের মতো জটিল রোগ বাড়ছে। অভিযোগ রয়েছে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর শুধু লাইসেন্স দিয়েই দায়িত্ব শেষ করছে, কার্যকর তদারকি নেই। এই সুযোগে অসাধু ব্যবসায়ীরা অনুমোদনহীন ও ক্ষতিকর ওষুধ বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বিশেষ প্রতিবেদক: ঐতিহ্যবাহী ইউনানি ও আয়ুর্বেদ ওষুধশিল্প এখন বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, অনেক কোম্পানি নির্ধারিত ভেষজ উপাদান ব্যবহার না করে সস্তা ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল যেমন সিলডেনাফিল সাইট্রেড ও ডেক্সামেথাসনের ব্যবহার করছে। দ্রুত ফল পাওয়ার লোভে এই ধরনের রাসায়নিক মিশিয়ে ওষুধ তৈরি করা হচ্ছে, যা স্বল্পমেয়াদে কাজ করলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হতে পারে।
বিশেষ করে যৌনশক্তিবর্ধক ও মোটা হওয়ার ওষুধে এসব কেমিক্যালের ব্যবহার বেশি দেখা যাচ্ছে। যেখানে আসল ইউনানি-আয়ুর্বেদ ওষুধ ধীরে ধীরে কার্যকর হয়, সেখানে এসব ভেজাল ওষুধ ১-২ ঘণ্টার মধ্যেই কাজ করছে—যা এর ভেতরে কেমিক্যাল থাকার বড় ইঙ্গিত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অনেক ব্যবহারকারীও দ্রুত ফল পেলেও পরে নানা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার অভিযোগ করেছেন।
অন্যদিকে বাজারে অসংখ্য কোম্পানি গড়ে উঠেছে, যাদের অনেকেই ফর্মুলারি মেনে চলে না। যেমন হাইম্যাক্স ইউনানি ফার্মাসিউটিক্যালস, আরগন ফার্মাসিটিক্যালস, জিকে ফার্মা ও মডার্ন হারবালের মতো প্রতিষ্ঠানের কিছু পণ্যের বিরুদ্ধে ভেজালের অভিযোগ উঠেছে। এসব কোম্পানি ইংরেজি ট্রেড নাম ব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে, ফলে অনেকেই এগুলোকে অ্যালোপ্যাথিক ওষুধ মনে করে ভুল করছেন।
ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রেও বড় ধরনের অনিয়ম রয়েছে। অনেক কোম্পানি বিক্রেতাদের ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন দিচ্ছে, যা আসল ভেষজ উপাদান ব্যবহার করে সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর ফলে সস্তা কেমিক্যাল দিয়ে তৈরি ওষুধই বেশি ছড়িয়ে পড়ছে বাজারে।
এদিকে তদারকির দায়িত্বে থাকা সংস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়া এবং কিছু অসাধু চক্রের প্রভাবের কারণে ভেজাল ওষুধ প্রস্তুতকারীরা পার পেয়ে যাচ্ছে। ফলে জনস্বাস্থ্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে এবং ঐতিহ্যবাহী এই চিকিৎসা পদ্ধতির বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
ভেজালের শীর্ষে যারা
লাইসেন্সপ্রাপ্ত ইউনানী, আর্য়ূবেদিক ও হারবাল কোম্পানীগুলোর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি বাদে সবাই ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ বিক্রি করছে দেদারছে। এদের প্রধান ব্যবসা হচ্ছে যৌনশক্তি বর্ধক অনুমোদনহীন ওষুধ বিক্রি করা। এদের ২য় বিক্রির তালিকায় রয়েছে রুচি বর্ধক ভেজাল ও ক্ষতিকর ওষুধ। অনুসন্ধানে দেখা দেখা গেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ভেজালের শীর্ষে আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস
আরগন ফার্মাসিউটিক্যালস ময়মনসিংহের ঠিকানায় লাইসেন্স নিলেও ঢাকায় বসে ব্যবসা পরিচালনা করছে। ‘আরগন ল্যাবরেটরী’ নামে অনুমোদন নিয়ে ভিন্ন নামে ওষুধ বাজারজাত করছে। ইউনানি-আয়ুর্বেদ প্রতিষ্ঠানের জন্য নিষিদ্ধ হলেও তারা “ফার্মাসিউটিক্যালস” শব্দ ব্যবহার করে গ্রাহকদের বিভ্রান্ত করছে। তাদের প্রধান ব্যবসা অনুমোদনহীন যৌনশক্তিবর্ধক ‘নাইটেক্স’ ও ‘রিষ্টোর’। এছাড়া ডায়াবেটিস, ভিটামিন ও মিনারেল ওষুধ বিক্রি করছে, যেগুলোর অনেকই অনুমোদিত তালিকায় নেই।
জিকে ফার্মা (ইউনানী)
জিকে ফার্মা-এর লাইসেন্স গাজীপুরে হলেও কার্যক্রম ঢাকাকেন্দ্রিক। ৫০টি ওষুধের লাইসেন্স থাকলেও বাস্তবে কয়েকটি যৌনশক্তিবর্ধক ও ডায়াবেটিস ওষুধই বাজারে আছে। ‘কমান্ড’ ও ‘গোল্ডেন লাইফ’ নামে উচ্চমূল্যের ওষুধ বিক্রি করে। অভিযোগ রয়েছে, ডায়াবেটিসের ওষুধ প্রথমে কাজ করলেও পরে রোগ আরও বেড়ে যায়।
ন্যাচার ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী) লিঃ
ন্যাচার ফার্মাসিউটিক্যালস অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করছে। মিরপুরে কারখানার পাশাপাশি গোপন ডিপো থেকে এসব পণ্য সরবরাহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সুরমা ফার্মাসিউটিক্যালস (ইউনানী)
সুরমা ফার্মাসিউটিক্যালস-এর ‘আরক পুদিনা’ ও ‘সেব-এস’ সিরাপ ব্যাপক বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব পণ্যে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের কারণে দ্রুত শরীরের পরিবর্তন ঘটে। নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলেও এখনো রিপোর্ট পাওয়া যায়নি, যা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
হামজা ল্যাবরেটরীজ (ইউনানী)
হামজা ল্যাবরেটরীজ বিভিন্ন সিরাপ, ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল বাজারজাত করছে। অভিযোগ আছে, যৌনশক্তিবর্ধক ওষুধে ভায়াগ্রার উপাদান এবং অন্যান্য রোগের ওষুধে অ্যালোপ্যাথিক কাঁচামাল ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে, যদিও প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
চিত্রা ল্যাবরেটরীজ (ইউনানী)
চিত্রা ল্যাবরেটরীজ-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদনের অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিভিন্ন সিরাপ ও ভিটামিন পণ্যে অতিরিক্ত কেমিক্যাল ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
সব মিলিয়ে ইউনানি, আয়ুর্বেদিক ও হারবাল ওষুধশিল্পের বর্তমান চিত্র গভীর উদ্বেগজনক। একদিকে অসাধু ব্যবসায়ীদের অনিয়ম ও ভেজাল উৎপাদন, অন্যদিকে তদারকির ঘাটতি—এই দুইয়ের চাপে সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে পড়ছে। দ্রুত লাভের আশায় ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে তৈরি ওষুধ মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদে মারাত্মক ক্ষতি করছে, যা অনেক ক্ষেত্রে জীবননাশের কারণও হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর নজরদারি, নিয়মিত ল্যাব পরীক্ষা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কঠিন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানোও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যাতে তারা ভেজাল ও প্রতারণামূলক ওষুধ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।
