বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তর দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে থাকা একটি বড় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানেই দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করছে—এমন অভিযোগ উঠেছে নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীকে ঘিরে। ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, অবৈধ সম্পদ অর্জন, মানিলন্ডারিং এবং অফিসের ভেতরে বিতর্কিত ব্যক্তিগত সম্পর্ক—সব মিলিয়ে তাকে নিয়ে এখন নানা আলোচনা চলছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা এক অভিযোগে বলা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন সমীরণ মিস্ত্রী। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি একা নন—তার ভাই উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মিঠুন মিস্ত্রী এবং আরেক উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকে সঙ্গে নিয়ে গণপূর্তে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেট বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে প্রভাব খাটিয়ে ঠিকাদার নির্বাচন, কাজ পাইয়ে দেওয়া এবং প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ করার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সমীরণ মিস্ত্রীর নামে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট এবং বিলাসবহুল গাড়ি রয়েছে। শুধু রাজধানীতেই নয়, তার গ্রামের বাড়িতেও রয়েছে অত্যাধুনিক বাংলো এবং খামারবাড়ি। এসব সম্পদের বেশিরভাগই তার সরকারি আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে, সমীরণ মিস্ত্রী ও তার ভাই মিঠুন মিস্ত্রী ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও সম্পদ কিনেছেন। কলকাতায় বাড়ি এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ করার কথাও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল অর্থ মানিলন্ডারিং করে ভারতে পাচার করা হয়েছে। বিভিন্ন ব্যাংকে কয়েক কোটি টাকার স্থায়ী আমানত বা এফডিআর থাকার তথ্যও অভিযোগে উঠে এসেছে, যা তাদের সরকারি আয়ের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন বলে বলা হয়েছে।
শুধু সম্পদ অর্জনই নয়, আয়কর ফাইলে এসব সম্পদের প্রকৃত তথ্য গোপন করার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সমীরণ মিস্ত্রী এবং তার পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত আয়কর দাখিল করলেও সেখানে প্রকৃত সম্পদের তথ্য লুকিয়ে রেখে আয়কর ফাঁকি দিয়ে আসছেন।
গণপূর্তের বিভিন্ন টেন্ডার প্রক্রিয়ায়ও সমীরণ মিস্ত্রীর প্রভাব থাকার অভিযোগ উঠেছে। বলা হচ্ছে, তিনি ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ পাইয়ে দিতেন এবং অনেক ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজনদের নাম ব্যবহার করে পরোক্ষভাবে ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করতেন। এসব কাজে তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসী।
এই দুই কর্মকর্তাকে ঘিরে অফিসের ভেতরেও নানা বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন একই বিভাগে কাজ করার সুবাদে সমীরণ মিস্ত্রী ও সিফাত ওয়াসীর মধ্যে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। ব্যক্তিগত এই সম্পর্কের কারণে দপ্তরের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি তাদের একসঙ্গে ভারত সফরের ঘটনাও অফিসের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
সমীরণ মিস্ত্রী প্রায় সাত বছর গণপূর্তের ইএম সার্কেল–৩ এর অধীন ইএম বিভাগ–৭-এ দায়িত্ব পালন করেন, যার আওতায় জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা পড়ে। এই সময়েই তাকে নিয়ে নানা অভিযোগ ছড়ায় এবং অনেকেই তাকে ব্যঙ্গ করে “জাতীয় সংসদের টাকাখেকো ইঞ্জিন” বলেও উল্লেখ করতে শুরু করেন। অভিযোগ রয়েছে, ওই সময় তিনি প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে নিজের অবস্থান শক্ত করেছিলেন।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ উঠেছে তথাকথিত “আমব্রেলা প্রজেক্ট” নিয়ে। বলা হচ্ছে, জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে বিভিন্ন অঙ্গভিত্তিক প্রকল্প দেখিয়ে ৩০ থেকে ৪০টি দরপত্র দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় শত কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো—এই প্রকল্পগুলোর কার্যাদেশ দেওয়া, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নের পুরো প্রক্রিয়াতেই সমীরণ মিস্ত্রীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।
গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর সমীরণ মিস্ত্রীকে ইএম বিভাগ–৭ থেকে পিএন্ডডি বিভাগ–১-এ বদলি করা হয়। একই সময়ে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী সিফাত ওয়াসীকেও সেখানে বদলি করা হয়। এই ঘটনা নিয়েও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, পরে গণপূর্ত সচিব শহীদুল্লাহ খন্দকার এবং গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফ আহমেদের প্রভাব ব্যবহার করে তিনি দীর্ঘদিন একই গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে নিজের পোস্টিং ধরে রেখেছিলেন।
এদিকে সিফাত ওয়াসীর বিরুদ্ধেও দায়িত্ব পালনে অদক্ষতা ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বলা হচ্ছে, পুরো সময়জুড়ে তিনি মূলত নির্বাহী প্রকৌশলী সমীরণ মিস্ত্রীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেই কাজ করেছেন এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তে তার প্রভাবই ছিল প্রধান।
এতসব গুরুতর অভিযোগ সামনে আসার পরও এখন পর্যন্ত সমীরণ মিস্ত্রীর বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই মনে করছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের জন্য একটি শক্তিশালী সুরক্ষা বলয় কাজ করছে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সমীরণ মিস্ত্রী, মিঠুন মিস্ত্রী ও সিফাত ওয়াসীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। পরে অভিযোগপত্রসহ বার্তা পাঠানো হলে তারা কোনো প্রতিক্রিয়া না দিয়ে যোগাযোগকারীকে ব্লক করে দেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনে দায়ের করা আবেদনে সমীরণ মিস্ত্রী, মিঠুন মিস্ত্রী এবং সিফাত ওয়াসীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জন, মানিলন্ডারিং, আয়কর ফাঁকি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তীতে সমীরণ মিস্ত্রী পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করার চেষ্টা করেন। এমনকি তিনি প্রভাবশালী নেতা ওবায়দুল কাদের–এর নাম ব্যবহার করে মন্ত্রণালয় ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ফোন করানোর চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃ নুসরাত জাহান মিশু
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
ফোন নাম্বারঃ 01868533641
Email: News@amadershomoykal.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়ঃ ৩০-৩১, দিলকুশা সি/এ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
Copyright © 2025 All rights reserved আমাদের সময় কাল