বাংলাদেশ থেকে ভারতে চলে যাওয়া হিন্দু, শিখ ও জৈন শরণার্থীদের আগামী ছয় মাসের মধ্যে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ।
একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের শনাক্ত করে তাদের সরিয়ে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
শনিবার পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়িতে ভারতের তিনটি নতুন ফৌজদারি আইন নিয়ে আয়োজিত এক প্রদর্শনীতে বক্তব্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন অমিত শাহ।
তিনি জানান, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর আওতায় নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়া ও চূড়ান্ত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের আটটি জেলার জেলা প্রশাসকদের ক্ষমতা দিয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
অমিত শাহ বলেন, “বাংলাদেশ থেকে বাধ্য হয়ে পালিয়ে আসা সব হিন্দু, শিখ ও জৈন শরণার্থীকে অবশ্যই মর্যাদার সঙ্গে এখানে ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়া হবে।”
তিনি দাবি করেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যেই এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে।
সিএএতে কারা নাগরিকত্বের সুযোগ পাবেন?
ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ( সিএএ) অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে ভারতে যাওয়া নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
আইনটির আওতায় হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের যেসব মানুষ নির্যাতন বা নিপীড়নের কারণে ওই তিন দেশ থেকে ভারতে এসেছেন এবং ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর বা তার আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন, তারা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে ভারতীয় নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে পারেন।
এই আইন নিয়ে ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম সম্প্রদায়কে এর আওতায় না রাখার বিষয়টি নিয়ে বিরোধী দল ও বিভিন্ন সংগঠন আপত্তি জানিয়েছে।
অন্যদিকে বিজেপি সরকারের দাবি, প্রতিবেশী তিন দেশে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্যই এই আইন করা হয়েছে।
অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর নীতি
শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়টির পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন অমিত শাহ।
তিনি জানান, অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে সরকার ‘ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট’- অর্থাৎ শনাক্ত করা, তালিকা থেকে বাদ দেওয়া এবং দেশ থেকে ফেরত পাঠানোর নীতি অনুসরণ করবে।
পশ্চিমবঙ্গের জনগণের উদ্দেশে অমিত শাহ বলেন, “আমি আবারও বাংলার মানুষকে প্রতিশ্রুতি দিতে চাই- প্রতিটি অনুপ্রবেশকারীকে শনাক্ত করে পশ্চিমবঙ্গ থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে।”
তার এই মন্তব্যে পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অভিবাসীদের নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে স্পর্শকাতর ইস্যু
বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত থাকায় পশ্চিমবঙ্গে সীমান্ত পারাপার ও অভিবাসনের বিষয়টি বহু বছর ধরেই অত্যন্ত স্পর্শকাতর রাজনৈতিক ইস্যু।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অভিবাসন ঠেকানো এবং সিএএ কার্যকর করার বিষয়কে রাজনৈতিক প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।
অন্যদিকে রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বিরোধীরা সিএএ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে আপত্তি জানিয়েছেন।
শিলিগুড়ির বক্তব্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেও সরাসরি আক্রমণ করেন অমিত শাহ।
তিনি বলেন, “মমতা দিদি, আপনি এটি গ্রহণ করেননি। কিন্তু আপনার সরকারও নেই, আপনিও নেই। এখন ভারতীয় জনতা পার্টির সরকার।”
অমিত শাহের এই বক্তব্যে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে সিএএ, নাগরিকত্ব, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং অবৈধ অভিবাসন- এই চারটি ইস্যু নতুন করে সামনে চলে আসতে পারে।
আট জেলা প্রশাসককে দেওয়া হয়েছে ক্ষমতা
অমিত শাহের বক্তব্য অনুযায়ী, সিএএর অধীনে নাগরিকত্বের আবেদন দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ ও চূড়ান্ত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের আটটি জেলার জেলা প্রশাসকদের বিশেষ ক্ষমতা দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর ফলে আবেদনকারীদের নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই উদ্যোগ বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দু, শিখ ও জৈন সম্প্রদায়ের যেসব মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বসবাস করছেন, তাদের মধ্যে নাগরিকত্ব পাওয়ার প্রত্যাশা বাড়াতে পারে।
তবে নাগরিকত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইনের শর্ত, আবেদনকারীর যোগ্যতা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ থাকবে।
অমিত শাহের বক্তব্যে একই সঙ্গে দুটি পৃথক নীতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে- একদিকে সিএএর আওতায় যোগ্য শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করা, অন্যদিকে অবৈধ অভিবাসীদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া।
বিজেপি দীর্ঘদিন ধরে এই দুই বিষয়কে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত নিরাপত্তা ও জনসংখ্যাগত পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত করে রাজনৈতিকভাবে তুলে ধরে আসছে।
ফলে আগামী দিনে রাজ্যে নাগরিকত্বের আবেদন, সিএএ বাস্তবায়ন এবং অবৈধ অভিবাসনবিরোধী অভিযানের বিষয়গুলো রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিন নতুন ফৌজদারি আইন নিয়ে প্রদর্শনীতে বক্তব্য
অমিত শাহ এসব মন্তব্য করেন শিলিগুড়িতে ভারতের তিনটি নতুন ফৌজদারি আইন নিয়ে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীতে।
আইন তিনটি হলো-
• ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (বিএনএস)
• ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (বিএনএসএস)
• ভারতীয় সাক্ষ্য অধিনিয়ম (বিএসএ)
পুরোনো ভারতীয় দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও ভারতীয় সাক্ষ্য আইনের পরিবর্তে নতুন এই তিন আইন কার্যকর করেছে ভারত সরকার।
প্রদর্শনীতে এসব আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের নাগরিকত্ব ও অভিবাসন ইস্যুতেও নিজের সরকারের অবস্থান স্পষ্ট করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
তার বক্তব্যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নির্দিষ্ট ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ তৈরি করতে পারে। সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃ নুসরাত জাহান মিশু
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
ফোন নাম্বারঃ 01868533641
Email: News@amadershomoykal.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়ঃ ৩০-৩১, দিলকুশা সি/এ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
Copyright © 2025 All rights reserved আমাদের সময় কাল