নিজস্ব প্রতিবেদক : ক্ষমতার প্রভাব, কথিত রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া, ভুয়া বিল-ভাউচার এবং ঠিকাদারি সিন্ডিকেট—এসবের সমন্বয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগকে ঘিরে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, বছরের পর বছর প্রভাব খাটিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, জাহাজের জ্বালানি ব্যবহারে কারসাজি এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ‘সিন্ডিকেট’ গড়ে তুলেছেন তিনি। আব্দুর রহিমকে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান ও সাবেক নৌ-প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পরিচিত বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও তাঁর প্রশাসনিক প্রভাব অক্ষুণ্ন থাকার বিষয়টি নিয়েও বিআইডব্লিউটিএর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি তাঁকে বরিশালের ডিইপিটিসি-তে প্রিন্সিপাল হিসেবে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়ায় নতুন করে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত ও নিষ্পত্তির পরিবর্তে তাঁকে এক পদ থেকে অন্য পদে দায়িত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে কার্যত ‘পুরস্কৃত’ করা হচ্ছে।
অলস জাহাজ কাগজে সচল, তেল খরচের বিলও সচল! সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিআইডব্লিউটিএর নারায়ণগঞ্জের নৌ-সংরক্ষণ ও পরিচালনা দপ্তরকে ঘিরে।
সূত্রের দাবি, ২৫০ টন উত্তোলনক্ষম উদ্ধারকারী জাহাজ ‘প্রত্যয়’ নারায়ণগঞ্জের ৫ নম্বর ঘাটে শীতলক্ষ্যা নদীতে দীর্ঘদিন অলস অবস্থায় পড়ে থাকলেও নথিপত্রে সেটিকে সচল দেখিয়ে বছরের পর বছর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেলের বিল তোলা হয়েছে। অথচ একই সময়ে অন্য উদ্ধারকারী জাহাজ ‘নির্ভীক’ বরিশাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, জাহাজ বাস্তবে কতটুকু চলেছে, কত জ্বালানি ব্যবহার করেছে এবং কাগজে দেখানো জ্বালানি খরচের সঙ্গে বাস্তবতার কতটা মিল রয়েছে—এসব বিষয়ে গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। এমনকি দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানেও নারায়ণগঞ্জ কার্যালয়ের নথিপত্রে জ্বালানি খরচের গরমিল ও আর্থিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগের আরেকটি বড় অংশ আন্তর্জাতিক প্রকল্পের আওতায় আমদানিকৃত বয়া-বিকন বাতির কাজকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের দাবি, আব্দুর রহিম তাঁর অনুগত ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত ‘বাহার’-এর সঙ্গে যোগসাজশে একটি ঠিকাদারি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। ২০১৯-২০ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত নির্দিষ্ট কয়েকটি নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিয়ে অন্য ঠিকাদারদের কার্যত বাইরে রাখা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই প্রক্রিয়ায় সরকারি অর্থ আত্মসাতের জন্য ভুয়া বিল-ভাউচার ব্যবহারের ঘটনাও ঘটেছে। অভিযোগে উল্লিখিত কয়েকটি বিলের তথ্য হলো—
আখি এন্টারপ্রাইজ: টিপি-১৩৫-এর ভুয়া বিলের মাধ্যমে ৭ লাখ ৭২ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। তানিয়া এন্টারপ্রাইজ: এমপি-১২-এর ভুয়া বিলে ৬ লাখ ৮১ হাজার টাকা এবং স্পিডবোট-১ মেরামতের নামে ৮ লাখ ৮১ হাজার ১০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। তানজিল ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস: টিপি-৮০-এর ভুয়া বিলে ৭ লাখ ১৩ হাজার ৩৫২ টাকা এবং টিপি-১৭৩-এর নামে ৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ। আলিফ এন্টারপ্রাইজ: টিপি-৪৫-এর ভুয়া বিলে ৪ লাখ ৯৮ হাজার ১৫১ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ।
এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কাজের কার্যাদেশ, মেরামত-সংক্রান্ত নথি, বিল-ভাউচার, মাপজোক বই, জাহাজের লগবুক এবং বাস্তবে কাজ হয়েছে কি না—এসব নথি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, ভুয়া বিল-ভাউচার ও বিভিন্ন অনিয়মের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে আব্দুর রহিম ঢাকা, সাভার, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ এবং নিজ জেলা পাবনায় বিপুল স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ গড়ে তুলেছেন।
উত্তর মুগদা: ‘আলিফ গার্ডেন’ (৫৮/৩০/গ)-এ দুটি অত্যাধুনিক ফ্ল্যাট এবং ঝিলপাড় রোডের ৫৪ নম্বর বাড়িতে দুটি ফ্ল্যাট—অভিযোগকারীদের হিসাবে মূল্য প্রায় ৫ কোটি টাকা।
কেরানীগঞ্জ: ফতুল্লা লঞ্চঘাটের বিপরীতে ঠিকাদার বাহারের সঙ্গে যৌথ মালিকানায় বিশাল ডকইয়ার্ড—অভিযোগে যার মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলা হয়েছে।
আশুলিয়া: ইসলামনগরে আরএস দাগ-১৮৩৩-এর ১০ কাঠা জমির ওপর আব্দুর রহিম ও লিমা তাবাসসুমের নামে পাঁচতলা ভবন—অভিযোগিত মূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা।
সাভার: কাঠগড়ায় চার ইউনিটের সাততলা ভবন এবং সাভার বাজারের অন্ধ মার্কেটের দ্বিতীয় তলায় দুটি দোকান—অভিযোগিত মূল্য ২০ কোটি টাকার বেশি।
মোহাম্মদপুর: হাউজিং এলাকায় প্রায় ৬ শতাংশ মূল্যবান জমি—অভিযোগিত মূল্য প্রায় ৭ কোটি টাকা।
এ ছাড়া রামপুরা ও হাতিরপুলে একাধিক ফ্ল্যাট-বাড়ি এবং ঢাকা ও সাভারে নিজের ও বেনামে আরও জমি ও প্লট থাকার অভিযোগও রয়েছে। পাবনায় ‘শতকোটি টাকার’ সম্পদের অভিযোগ অভিযোগের সবচেয়ে বিস্ফোরক অংশটি তাঁর গ্রামের বাড়িকে ঘিরে। অভিযোগকারীরা দাবি করছেন, পাবনায় নিজ গ্রামের আশপাশে প্রভাব খাটিয়ে একটি বড় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারের বাড়ি দখল বা ক্রয়ের মাধ্যমে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। এর মূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের মালিকানা, ক্রয়মূল্য, অর্থের উৎস এবং প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করতে ভূমি রেকর্ড, দলিল, নামজারি, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেন ও সম্পদ বিবরণী যাচাই প্রয়োজন। অভিযোগের পরও ব্যবস্থা নেই কেন? আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং বিআইডব্লিউটিএ চেয়ারম্যানের দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। কিন্তু অভিযোগের পরও কার্যকর ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এত গুরুতর অভিযোগের পরও যদি শুধু বদলি কিংবা অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে সেটি অনিয়ম বন্ধের বদলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে প্রশাসনিকভাবে আরও শক্তিশালী করারই বার্তা দেয়। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয় আব্দুর রহিমের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রতিটি দিকই নথিভিত্তিক ও স্বাধীন তদন্তের আওতায় আনা জরুরি।
বিশেষ করে জাহাজের লগবুক ও জ্বালানি হিসাব, ভুয়া বিল-ভাউচারের অভিযোগ, ঠিকাদারি কার্যাদেশ, প্রকল্পভিত্তিক অর্থ ব্যয়, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা এবং তাঁর ও পরিবারের নামে থাকা সম্পদের বৈধ উৎস—সবকিছু খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা এবং অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। আর কোনো অভিযোগ অসত্য হলে তদন্তের মাধ্যমেই তা পরিষ্কার হওয়া উচিত। বিআইডব্লিউটিএর সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাবি, ক্ষমতার প্রভাব নয়—প্রমাণের ভিত্তিতে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের ভাষ্য, সরকারি সম্পদ ও অর্থের ওপর কোনো কর্মকর্তা বা সিন্ডিকেটের ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া যায় না। নোট: প্রতিবেদনে উল্লিখিত অর্থের পরিমাণ, সম্পদের মালিকানা, রাজনৈতিক ঘনিষ্ঠতা, ভুয়া বিল এবং আত্মসাতের অভিযোগগুলো অভিযোগকারীদের দেওয়া তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট নথি, দুদকের অনুসন্ধান-সংক্রান্ত তথ্য এবং আব্দুর রহিমের বক্তব্য যাচাই করে প্রকাশ করা সাংবাদিকতার পেশাগত মানদণ্ডের জন্য অপরিহার্য।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃ নুসরাত জাহান মিশু
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
ফোন নাম্বারঃ 01868533641
Email: News@amadershomoykal.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়ঃ ৩০-৩১, দিলকুশা সি/এ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
Copyright © 2025 All rights reserved আমাদের সময় কাল