নিজস্ব প্রতিবেদক | ৩০ জুন ২০২৬
দরপত্র ছাড়াই কোটি টাকার হরিলুট
সরকারি অর্থ লোপাটের এক নজিরবিহীন ও চাঞ্চল্যকর চিত্র ফুটে উঠেছে দৈনিক যুগান্তরের একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে উঠেছে ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারি বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ।
তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মার্চ-এপ্রিল মাসে কাকরাইলের ২০ তলা বিশিষ্ট ‘বিচারপতি ভবন’-এ নতুন গেট স্থাপন, সংস্কার, সীমানাপ্রাচীর মেরামত এবং নিরাপত্তা গ্রিল বসানোর মতো স্পর্শকাতর কাজগুলো কোনো প্রকার দরপত্র আহ্বান ছাড়াই সরাসরি পছন্দের ঠিকাদার আলাল মিয়াকে দিয়ে করিয়ে নেওয়া হয়। প্রশ্নবিদ্ধ এই কাজের প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয় ১ কোটি ৩৩ লক্ষ টাকা। আইনি জটিলতা এড়াতে যেনতেন প্রকারে ২৯ মে ২০২৫-এ দরপত্র (আইডি: ১১২০৪৫৬) আহ্বান করা হয়। তড়িঘড়ি করে ১৭ জুন ‘নোয়া’ (NOA) প্রদান এবং ১৯ জুন কন্ট্রাক্ট সইয়ের নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। জনশ্রুতি রয়েছে, কাজ শেষ হওয়ার পর শুধুমাত্র নামকাওয়াস্তে টেন্ডার ডেকে ওই অর্থ লোপাট করা হয়েছে।
এই দুর্নীতির কেন্দ্রে থাকা ‘Semtech Engineering & Construction’-এর মালিক আলাল মিয়া, যার ফেসবুক প্রোফাইলের তথ্য অনুযায়ী তিনি প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং ঠিকানা: ৬৪, তেজকুনিপাড়া, তেজগাঁও, ঢাকা। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি এই অনিয়ম খতিয়ে দেখে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সুপারিশ করলেও, ক্ষমতার অদৃশ্য ইশারায় অদ্যাবধি অভিযুক্ত আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান হাবীবের জন্য টেন্ডারবিহীন এই দুর্নীতি যেন এক নৈমিত্তিক ব্যাপার! এর আগেও তিনি যেখানেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই সরকারি অর্থ হরিলুটে মেতে উঠেছেন। ২০২৪ সালের ২০ ও ২২ মে ‘দৈনিক জাগো নারায়ণগঞ্জ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে কর্মরত থাকাকালীন তিনি নারায়ণগঞ্জ সার্কিট হাউজের ১.৩৮ কোটি টাকার কাজ কোনো আনুষ্ঠানিক দরপত্র ছাড়াই সরাসরি মৌখিক নির্দেশে করিয়েছেন। নিয়মবহির্ভূত এই লুটপাটের মহোৎসবের বিরুদ্ধে স্থানীয়রা মানববন্ধন করলেও, প্রভাবশালী এই কর্মকর্তা ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। মৌখিক আদেশের নামে সরকারি অর্থ নয়ছয়ের এই অশুভ সিন্ডিকেট কি তবে প্রশাসনকে পকেটস্থ করে ফেলেছে?
রাজনৈতিক শেল্টারে দুর্নীতির ‘গডফাদার’ আহসান হাবীব: উত্থানের নেপথ্যে লিকু-মুক্তাদির সিন্ডিকেট
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এপিএস লিকুর আত্মীয় পরিচয়ের দাপট দেখিয়েই মূলত ক্ষমতার বলয়ে ঢুকে পড়েন এই আহসান হাবীব। সেই পরিচিতিকে পুঁজি করে তিনি পরবর্তীতে সাবেক মন্ত্রী ও ‘জনতার মঞ্চ’-এর নেপথ্য কারিগর র আ ম ক ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ওঠেন। প্রশাসনের অন্দরমহলে কান পাতলেই শোনা যায়, ওবায়দুল মুক্তাদিরের যেকোনো অপকর্ম বাস্তবায়নের প্রধান সহযোগী বা ‘অনুগত প্রকৌশলী’ হিসেবে সবার আগে আহসান হাবীবেরই নাম উচ্চারিত হয়।
রংপুর মুন্সিপাড়ার মো. আমজাদ হোসেনের ছেলে আহসান হাবীবের বুয়েট জীবনের শুরু থেকেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের নজির রয়েছে। ২০০২ ব্যাচের এই শিক্ষার্থী বুয়েটের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ছাত্ররাজনীতির অন্ধকার গলিতে পা বাড়ান। বুয়েটের ১৯৬২ সালের অধ্যাদেশের ১৬ ধারা অনুযায়ী ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরনের ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও, ছাত্রলীগ সেখানে গোপনে দাপট চালিয়েছে। বিশেষ করে ২০০২ সালে সাবেকুন নাহার সনির মর্মান্তিক মৃত্যুর পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করলেও, আহসান হাবীব তখনো রশিদ হলের ছাত্রলীগের কমিটিতে নিজের অবস্থান পাকাপোক্ত করেন।
পরবর্তীতে ২০০৬ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রিপন-রোটন আসার পর, নিজ জেলা রংপুরের পার্শ্ববর্তী গাইবান্ধার সন্তান রিপনের সুবাদে বুয়েট ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ বাগিয়ে নেন এই উচ্চাভিলাষী ছাত্রনেতা। এরপর ২০০৮ সালের ২৮তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ২০১০ সালে তিনি গণপূর্ত বিভাগে যোগ দেন। সরকারি চাকরির মোহে বিসিএস-এর আগে একটি স্বনামধন্য স্টিল বিল্ডিং কোম্পানিতে ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করলেও, তার আসল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতার দাবার গুটি সাজানো।
এদিকে, রাজধানীর ধানমন্ডির অভিজাত এলাকার ৪৩ নম্বর বাসার ২/সি ফ্ল্যাটে স্ত্রী মোছাঃ ফারহানা সোহেলী (বিথী), ছেলে মিহির আহসান (১৪) ও মেয়ে জারা আহসানকে (৪) নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছেন আহসান হাবীব। বাইরে থেকে অত্যন্ত পরিপাটি এবং রুচিশীল মনে হলেও, ঠিকাদার মহলে তিনি পরিচিত ‘দুর্নীতির সিদ্ধহস্ত কারিগর’ হিসেবে। শেখ রেহানার ‘ক্যাশিয়ার’ খ্যাত বিতর্কিত নির্বাহী প্রকৌশলী আতিকুল ইসলাম আতিকের ‘ছায়াসঙ্গী’ হিসেবে থেকে তিনি টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যের এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। যার প্রতিটি পদে পদে মিশে আছে সরকারি অর্থ আত্মসাতের কলঙ্কিত ইতিহাস।
ভোল পাল্টানোর মাস্টারক্লাস: ছাত্রলীগ থেকে ‘জাতীয়তাবাদী’ সেজে আবারো লুটপাটের পায়তারা প্রকৌশলী আহসান হাবীবের
চাকরির শুরুটা রংপুরে হলেও, ২০১৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দিয়েই আহসান হাবীব তার ‘লুটেরা’ চরিত্রের জানান দিতে শুরু করেন। নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর নড়াইল, এরপর আত্মীয় লিকুর সুবাদে সাভার গণপূর্ত বিভাগ—সর্বত্রই চলেছে তার অপকর্মের জয়জয়কার। ৩০ অক্টোবর ২০২৩ পর্যন্ত সাভারে অবস্থান করে তিনি বদলি হয়ে যান নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে।
কিন্তু আসল খেলা শুরু হয় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর। ছাত্রলীগ থেকে রাতারাতি খোলস পাল্টে তিনি নিজেকে ‘বৈষম্যের শিকার’ কর্মকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন। রংপুরের ছাত্র সমন্বয়ক আখতার হোসেনের সঙ্গে একই এলাকার হওয়ার সুবাদে তার শরণাপন্ন হন এবং অভিযোগ ওঠে যে, ২ কোটি টাকার বিনিময়ে আখতার হোসেনকে ম্যানেজ করে তিনি ৯ অক্টোবর ২০২৪-এ ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১-এ গুরুত্বপূর্ণ পদ বাগিয়ে নেন। আর এখন, ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে হাওয়া বুঝে তিনি আবারো খোলস পাল্টে নিজেকে ‘বগুড়ার অধিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে জাতীয়তাবাদী ঘরানার লোক সেজেছেন! বর্তমানে তার চোখ ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৪-এর দিকে।
নিয়মনীতির তোয়াক্কা নেই, ‘লিকু ভাই’ই শেষ কথা
অভিযোগ রয়েছে, পূর্বের প্রতিটি কর্মস্থলে তিনি লিকুর আশীর্বাদপুষ্ট ছাত্রলীগ ক্যাডারদের দিয়ে দরপত্র ছাড়াই অগ্রিম কাজ করাতেন। তার দম্ভোক্তি ছিল স্পষ্ট—‘লিকু ভাই আমার আত্মীয়, তার লোকজনের কাজের জন্য আবার কিসের নিয়ম?’ ঠিকাদারি মহলে যখন জাতীয়তাবাদী ঘরানার ঠিকাদাররা কাজ চেয়েছেন, তখন তিনি তাদের খাইয়েছেন ‘এসএলটি (SLT)’ নামক অজুহাতের জুজু। আজ প্রশ্ন জাগে, বিচারপতি ভবনের কাজের সময় সেই এসএলটির জুজু কোথায় ছিল? এই দ্বিমুখী নীতিই প্রমাণ করে, তিনি কেবল ফ্যাসিবাদী আমলের দোসরই নন, বরং নিয়ম-নীতির কবর রচনা করা এক চতুর খেলোয়াড়।
বদলি নীতিমালা কি হাসিনার সাথে দিল্লিতে?
ফ্যাসিবাদী আমলে নষ্ট হওয়া প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে আছে আহসান হাবীবদের মতো ছাত্রলীগাররা। নিয়ম অনুযায়ী জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তাদের দুই বছরের আগেই বদলি করা হলেও, আহসান হাবীবের ক্ষেত্রে যেন নিয়ম নিজেই অচল। ১৩ এপ্রিল ২০২৩-এ ‘দৈনিক আজকের পত্রিকা’-য় ‘ঢাকায় গেড়ে বসেছে ৩৩ প্রকৌশলী’ শিরোনামে তার নাম আসার পরেও, পদায়ন নীতিমালার দোহাই দিয়ে তাকে কেউ সরাতে পারেনি। গত তিন বছর ধরে তিনি একই কৌশলে বহাল তবিয়তে টিকে আছেন। সাধারণ মানুষের বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য—প্রকৌশলীদের এই বদলি বা পদায়ন নীতিমালা কি তবে শেখ হাসিনার সাথে দিল্লিতে ঘুরতে গেছে?
প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে বসে থাকা আহসান হাবীবদের মতো ভোল পাল্টানো এই চাটুকাররা এখনো কি বহাল থাকবে? নাকি কর্তৃপক্ষ এবার তাদের মুখোশ উন্মোচন করে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃ নুসরাত জাহান মিশু
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
ফোন নাম্বারঃ 01868533641
Email: News@amadershomoykal.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়ঃ ৩০-৩১, দিলকুশা সি/এ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
Copyright © 2025 All rights reserved আমাদের সময় কাল