
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ গ্রামীণ মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এখন অযত্ন ও অবহেলার শিকার। কোথাও ছাদ ও দেয়াল খসে পড়ছে, কোথাও যাতায়াতের রাস্তা নেই, আবার কোথাও জোয়ারের পানিতে ডুবে যায় পুরো ক্লিনিক। বহু জায়গায় সেবা বন্ধ, আর যেখানে খোলা—সেখানেও ঠিকমতো চিকিৎসা মিলছে না।
প্রথম আলোর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্লিনিকেই গ্লুকোমিটার নষ্ট, ওষুধের সংকট তীব্র, অনেক জায়গায় স্বাস্থ্যকর্মী অনুপস্থিত। কিছু এলাকায় টাকা দিয়ে ওষুধ কিনতে হয়—এমন অভিযোগও উঠেছে।
গত আগস্টের শেষ দুই সপ্তাহে প্রথম আলোর প্রতিনিধিরা আট বিভাগের আট জেলার ৩২টি ক্লিনিক ঘুরে এই চিত্র দেখেছেন। দেখা গেছে, অনেক ক্লিনিক ভাঙাচোরা, বর্ষাকালে পানিতে ডুবে থাকে, টয়লেট নষ্ট, বিদ্যুৎ–পানির অভাব। প্রায় সব ক্লিনিকেই গ্লুকোমিটার অলস পড়ে আছে।
ওষুধ সংকট ও বিক্রির অভিযোগ
খুলনার দাকোপে মে মাসের পর থেকে ২৪টি ক্লিনিকে ওষুধ পৌঁছেনি। এক সিএইচসিপি বলেন, ‘প্যারাসিটামল ছাড়া কিছু নেই। মানুষ এলে সেটাই দিচ্ছি।’
বাগেরহাট ও নোয়াখালীর কয়েকটি ক্লিনিকে ওষুধ বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে। স্থানীয়রা জানান, দুই–পাঁচ টাকা না দিলে ওষুধ মেলে না। কেউ কেউ বলেন, “টাকা না দিলে স্যালাইনও দেয় না, দোকান থেকে কিনতে হয়।”
পানি ও সাপের ভয়
ঝালকাঠির কারুয়াকাঠী কমিউনিটি ক্লিনিক জোয়ারের পানিতে মাসে দুবার ডুবে যায়। ভেতরে সাপ ঢোকে, দেয়ালে পানির দাগ। ময়মনসিংহের পাইকুড়া ও আলালপুর ক্লিনিকের অবস্থা আরও ভয়াবহ—বর্ষায় হাঁটুপানি, দেয়াল ভাঙা, ঝোপঝাড়ে ঘেরা।
ভবন পরিত্যক্ত, তবু চলছে সেবা
নওগাঁর কন্যাপাড়া ক্লিনিক পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলেও সিএইচসিপিরা ঝুঁকি নিয়ে ভেতরে বসে সেবা দিচ্ছেন। কারও বক্তব্য, “যতক্ষণ থাকি আতঙ্কে থাকি, মাঝে মাঝে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে।”
জনবল সংকটে সেবা বন্ধ
সারা দেশে ৫০৯টি কমিউনিটি ক্লিনিকে কোনো সিএইচসিপি নেই। ময়মনসিংহের নান্দাইলের সৈয়দগাঁও ক্লিনিক ১০ মাস ধরে বন্ধ। অন্যান্য অনেক ক্লিনিকে স্বাস্থ্য সহকারী বা পরিবারকল্যাণ সহকারী নিয়মিত আসেন না।
দখল ও অনিয়ম
ঝালকাঠির আগরবাড়ি ক্লিনিক দখল করে রেখেছিলেন স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক ইউপি সদস্য। তিনি নিজের মতো করে ক্লিনিক চালাতেন, পরে পালিয়ে যান। এখন নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত সিএইচসিপিও নিয়মিত ক্লিনিক খোলেন না বলে অভিযোগ।
গুরুত্বপূর্ণ মতামত
নওগাঁর সিভিল সার্জন আমিনুল ইসলাম বলেন, “জেলার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কমিউনিটি ক্লিনিক ভবন জরাজীর্ণ। অনেকগুলো সংস্কার করেও টেকানো সম্ভব নয়।”
জনস্বাস্থ্যবিদ খায়রুল ইসলাম বলেন, “কমিউনিটি গ্রুপগুলোকে সক্রিয় করে ক্লিনিকের জবাবদিহি বাড়ানো জরুরি।”
পটভূমি
১৯৯৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করে, ২০০১ সালে বন্ধ হয়, আবার ২০০৯ সালে পুনরায় চালু হয়। বর্তমানে দেশে ক্লিনিকের সংখ্যা ১৪ হাজার ৪৬০। এখানে ২২ ধরনের ওষুধ বিনা মূল্যে দেওয়ার কথা, তবে বাস্তবে তা পাওয়া যাচ্ছে না।
