ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চলমান সংঘাত নিয়ে ‘ইরান জিতছে’—এমন একটি ধারণা তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে ইরানের দর-কষাকষির ক্ষমতা ততই কমে আসছে। এমন বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন।
সংবাদমাধ্যমটির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কয়েক সপ্তাহ ধরে ইরানের ওপর ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি করেছে এবং তেহরানের ওপর নানা ছাড়ের দাবি জানিয়েছে। কিন্তু ইরান আত্মসমর্পণ করেনি। দেশটির সরকার এখনও ক্ষমতায় রয়েছে এবং ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও আঞ্চলিকভাবে হুমকি হয়ে আছে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হরমুজ প্রণালী। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করার সক্ষমতা ইরানের রয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি তেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করেছিলেন, হরমুজ প্রণালী দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিতে পারে।
তবে সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পরিস্থিতি এখন আগের মতো নেই। যুদ্ধ মূলত দর-কষাকষির ক্ষমতা ও দীর্ঘ সময় চাপ সহ্য করার সক্ষমতার পরীক্ষা। সেই প্রতিযোগিতায় বর্তমানে ইরানের ওপরই চাপ বাড়ছে।
যুদ্ধের চতুর্থ পর্ব
সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রায় ছয় মাসের সংঘাতটি চারটি পর্বে ভাগ করা যায়।
প্রথম পর্ব শুরু হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ব্যাপক মার্কিন বিমান হামলার মধ্য দিয়ে এবং প্রায় ছয় সপ্তাহ ধরে উচ্চমাত্রার সামরিক অভিযান চলে। দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয় ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার মাধ্যমে। এর ধারাবাহিকতায় ১৭ জুন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MOU) স্বাক্ষরিত হয়।
তৃতীয় পর্ব শুরু হয় কয়েক সপ্তাহ পর, যখন ইরান আবার হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা সৃষ্টি ও হামলা শুরু করে। এর জেরে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রকে কার্যত হরমুজের নিয়ন্ত্রণ ইরানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার আহ্বানও ওঠে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সেখান থেকে সরে যায়নি।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে সামরিক অবরোধ এবং দেশটির তেল বাণিজ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা জোরদার করে। একই সময়ে মার্কিন সামরিক বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে নৌপথ পরিষ্কার করা এবং বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে যাচ্ছে।
এর ফলে ইরানের তেল রফতানির ওপর কার্যকর চাপ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। সিএনএনের উদ্ধৃত তথ্যানুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন যুদ্ধ শুরুর আগের মাত্রার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশে ফিরে এসেছে।
ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের ওপরই চাপ বেশি বাড়ছে। আর হরমুজ প্রণালীকে জিম্মি করে রাখার সক্ষমতা যদি তেহরান হারায়, তাহলে তার দর-কষাকষির ক্ষমতাও দ্রুত কমে যাবে।
দুর্বল অর্থনীতি আরও চাপে
বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে দুর্বল অবস্থায় ইরান এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। যুদ্ধের পর পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরে ইরানের অর্থনীতি ৫ শতাংশের বেশি সংকুচিত হতে পারে। একই সময়ে দেশটিতে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানি মুদ্রার মূল্যও ব্যাপকভাবে কমেছে। বেড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম। ইরানের শ্রম মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা সম্প্রতি জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রথম তিন মাসেই দেশটিতে ১০ লাখের বেশি কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হয়েছে।
এসব পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে ইরানের সক্ষমতা শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ওপর নির্ভর করছে না; এর সঙ্গে অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ।
হরমুজ নিয়ে ইরানের কৌশল
সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের কৌশল ছিল হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন করে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ানো। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত ট্রাম্প প্রশাসনকে পিছু হটতে বাধ্য করার চেষ্টা করা হতে পারে।
ইরান পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালাতে পারে। পাশাপাশি ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরাও লোহিত সাগর দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যাহত করার হুমকি দিতে পারে।
তবে এসব পদক্ষেপ ইরানের ওপর আরও সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে তেহরানের সামনে এখন বড় প্রশ্ন—হরমুজকে চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে যাবে, নাকি আন্তর্জাতিক চাপ কমাতে সমঝোতার পথে যাবে।
সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রভাব কমে গেলে দেশটির হাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দর-কষাকষির কার্যকর হাতিয়ারও খুব বেশি থাকবে না।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃ নুসরাত জাহান মিশু
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
ফোন নাম্বারঃ 01868533641
Email: News@amadershomoykal.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়ঃ ৩০-৩১, দিলকুশা সি/এ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
Copyright © 2025 All rights reserved আমাদের সময় কাল