আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের ষোলো দিনের মাথায় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৩.৯০ ডলার মানে ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া সত্ত্বেও গত কয়েক মাসে তেলের দাম একশ' ডলারের নিচেই অবস্থান করছে। এর পেছনে কূটনৈতিক সমঝোতার চেয়েও বড় ভূমিকা পালন করেছে সাগরে চলাচলকারী ‘অন্ধকার ট্যাংকার’ বা জিপিএস ট্র্যাকিং কিংবা ট্রান্সপন্ডার বন্ধ রাখা জাহাজগুলোর এক অভিনব কৌশল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা এবং বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা নিহত হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য চরম যুদ্ধের মুখে পড়েছিল। এর পরপরই ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি একশ' ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে অন্যতম ভয়াবহ তেল সংকট তৈরি করেছিল।
পারস্য উপসাগরে ইরানি ড্রোনের ক্রমাগত হুমকির মুখে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল কোম্পানিগুলো এক বিকল্প পথ বেছে নেয়। তারা ট্যাংকার ভাড়া করে সেগুলোর ট্রান্সপন্ডার বা সামুদ্রিক রেডিও ডিভাইস বন্ধ করে দেয় এবং মার্কিন নৌবাহিনীর পাহারায় উপসাগর থেকে অপরিশোধিত তেল বাইরে নিয়ে যেতে শুরু করে। এই ‘অন্ধকার’ ট্রানজিটগুলো হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে ওমান উপসাগরে পৌঁছায়, যেখানে কার্গোটি পরবর্তীতে বহনের জন্য অপেক্ষমাণ অন্য ট্যাংকারগুলোতে স্থানান্তর করা হয় এবং খালি জাহাজটি আবার প্রণালী দিয়ে ফিরে আসে।
এই কৌশলের কারণে সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর আর্থিক ও শারীরিক ঝুঁকি অনেকখানি কমে গেছে এবং বীমা খরচ ও হামলার আশঙ্কা মূলত মার্কিন সরকার ও তেল উৎপাদকদের ওপর বর্তেছে।
স্যাটেলাইট ইমেজের মাধ্যমে জাহাজ ট্র্যাককারী শিপিং ডেটা ফার্ম কেপ্লার জানিয়েছে, সম্প্রতি দুই সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাওয়া তরল কার্গোর ৮০ শতাংশেরও বেশি হয় ওমানি রুট, নয়তো জাতিসংঘ অনুমোদিত এবং ইরানবিরোধী শিপিং চ্যানেল ব্যবহার করেছে কিংবা অন্ধকার ট্রানজিট হিসেবে একই পথ অনুসরণ করেছে।
মার্কিন জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এই কৌশলটি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। আগস্ট মাসে প্রকাশিত তথ্যে অনুমান করা হয়েছে যে, প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন দৈনিক গড়ে ৮০ লাখ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেলের মধ্যে রয়েছে, যা ট্রান্সপন্ডার-ভিত্তিক ট্র্যাকিংয়ের হিসাবের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
কেপ্লারের রেকর্ড অনুযায়ী গত ১ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত মোট ১,৫১৪টি অন্ধকার ক্রসিং ঘটেছে।
এই কৌশলের বড় উদাহরণ হলো গ্রিক মালিকানাধীন সুপারট্যাংকার ‘কিকু’-র যাত্রা। গত ২৫ জুলাই বিকেলে কিকু কাতারের মেসাইদ রপ্তানি টার্মিনালে ভিড়েছিল। এর চার দিন পর তেল বোঝাই করে এটি হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ করে। এরপর ৩১ জুলাই দুবাই উপকূলের কাছাকাছি আসার পর কিকু ট্র্যাকিং সিস্টেম থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। জাহাজটির এআইএস ট্রান্সপন্ডার (এর পরিচয়, গতি, কোর্স এবং অবস্থান সম্প্রচার করে) বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বৈশ্বিক শিপিং ট্র্যাকিংয়ে চোখ রাখা যে কারো কাছে মনে হয়েছিল জাহাজটি যেন হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে। পরবর্তীতে ১ আগস্ট হরমুজ প্রণালির অপর প্রান্তে এটিকে আবার আবির্ভূত হতে দেখা যায়।
শুধু অন্ধকার ট্রানজিটই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকরা প্রণালিকে পুরোপুরি এড়িয়ে তেল পরিবহনের আরও নানা উপায় খুঁজে বের করেছে, যা তেল সরবরাহের ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণকে অনেকটাই খর্ব করেছে। সৌদি আরব পারস্য উপসাগরের ট্যাংকারগুলোতে তেল তোলার পরিবর্তে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে দৈনিক প্রায় ৫০ লাখ ব্যারেল তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের দিকে পাঠিয়ে দিয়েছে। অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকরাও প্রতিদিন আরও ২০ লাখ ব্যারেল তেল প্রণালির চারপাশ দিয়ে ঘুরিয়ে পাঠিয়েছে। এছাড়া ব্রাজিল, গায়ানা এবং ভেনেজুয়েলা সম্মিলিতভাবে দৈনিক অতিরিক্ত দশ লাখ ব্যারেলেরও বেশি উৎপাদন বাড়িয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রও প্রতিদিন বাজারে আরও কয়েকশ' হাজার ব্যারেল তেল যুক্ত করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন যে, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে তা নিশ্চিত করতেই এই সংঘাতের সূচনা হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি এই বৃহত্তর সংঘাতের কেন্দ্রীয় রণাঙ্গনে পরিণত হয়। তেহরান জলপথটিকে এক ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে ব্যবহার করে এর মধ্য দিয়ে ট্রাফিকে বাধা সৃষ্টি করে এবং যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা অবরোধ আরোপ করে।
সংঘাতের বিভিন্ন পর্যায়ে উভয়পক্ষই প্রণালির নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়েছে এবং নিজেদের প্রণালির অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করে সরু এই জলপথ পারাপারের জন্য নিজস্ব নিয়মে টোল ধার্য করেছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ আকরামুল হক
নির্বাহী সম্পাদকঃ নুসরাত জাহান মিশু
ফোন নাম্বারঃ 01718246730
ফোন নাম্বারঃ 01868533641
Email: News@amadershomoykal.com
সম্পাদকীয় ও বার্তা কার্যালয়ঃ ৩০-৩১, দিলকুশা সি/এ, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০
Copyright © 2025 All rights reserved আমাদের সময় কাল