
বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবন সংস্কারকাজে এক অত্যান্ত প্রকাশ্য অনিয়ম ঘটেছে—প্রথমে হিসাব করা হয় মাত্র ৩০ লাখ টাকায় হবে যে কাজ, শেষমেশ খরচ দাঁড়ায় দুই কোটি ১৬ লাখ টাকায়—প্রায় সাত গুণ বেশি। তদ্রূপ, দরপত্র আহ্বানের আগেই ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়ে গেছে, আর প্রতিযোগিতা ও অনুমোদনের নিয়ম অমান্য করে কাজ শুরু হয়েছে। এই তথ্য পাওয়া গেছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়‑এর গঠন করা তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
এরই মধ্যে রাজউক‑এর নিজস্ব তদন্তের রিপোর্ট ঠিক উল্টো চিত্র দিচ্ছে: “কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি” — এমন দাবি করা হয়েছে মাত্র এক সপ্তাহে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে জানিয়েছে, নকশা ও অনুমোদন ছাড়া কাজ হয়েছে, দরপত্র ছাড়াই কাজ শুরু হয়েছে এবং আর্থিক হিসাব অযৌক্তিকভাবে বড় হয়ে গেছে।
চেয়ারম্যানের সরকারি বাসভবনে। সংস্কারকাজের প্রাথমিক অনুমোদিত প্রকল্প মূল্য ছিল মাত্র ৩০ লাখ টাকা, কিন্তু শেষ বিল হয়েছে দুই কোটি ১৬ লাখ টাকা।
মূল তদন্তে উঠে এসেছে যে, মার্চ ২০২৪ সালে দরপত্র ছাড়াই কাজ শুরু হয়, তারপর ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দরপত্র আহ্বান করা হয় এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়াজ ট্রেডার্স নামের একটি সংস্থাকে কাগজে–কলমে কাজ দেওয়া হয়েছে।
তদুপরি, প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় যোগ রয়েছে সাবেক চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো. ছিদ্দিকুর রহমান (অব.), প্রধান নগর স্থপতি মোস্তাক আহমেদ ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রাহাত মুসলেমীন।
চেয়ারম্যান বাংলোর সংস্কারকাজ ভালোভাবে নকশা না অনুসরণ করে, পরবর্তী ভবন নির্মাণের সুপারিশ যেসব প্রতিবেদন দিয়েছে, সেগুলো উপেক্ষা করা হয়েছে। প্রকৌশল বিভাগ প্রথমে প্রাক্কলন করেছে ৩০ লাখ টাকা, কিন্তু অর্থায়ন প্রক্রিয়া ভুল পথে গেছে।
এক সময়কার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কাইছার লিখিতভাবে নকশা ও অনুমোদনের কপি চেয়েছিলেন, কিন্তু চেয়ারম্যানের চাপ এবং ডেপুটি প্রকৌশলী উজ্জ্বল মল্লিকের স্বাক্ষর না থাকায় চিঠি প্রত্যাহার করা হয়েছে। এরপর অনুমোদিত প্রকল্পমূল্য বাড়িয়ে দুই কোটি ৮৫ লাখ হয়েছিল এবং শেষমেশ দুই কোটি ১৬ লাখ টাকায় ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে—কিন্তু তখন কাজের ৮০ শতাংশ ইতিমধ্যেই সম্পন্ন হয়ে গেছে।
তদন্ত কমিটি কাজের গুণগতমান যাচাই ও ঠিকাদারকে পাওনা পরিশোধ করার সুপারিশ করেছিল, কিন্তু প্রকৃত দৃষ্টিতে মন্ত্রণালয় ও রাজউক প্রশাসনের দ্বারা কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি — শুধু কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
রাজউকের সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) ড. মো. আলম মোস্তফা জানিয়েছেন, এখনও পর্যন্ত তদন্ত সংক্রান্ত কোনো চিঠি বা নির্দেশনা মন্ত্রণালয় থেকে তারা পাননি।
পুরো ঘটনায় দেখা যাচ্ছে—দরপত্রের আগেই কাজ সম্পন্ন হওয়া, অনুমোদন ও নকশা ছাড়াই কাজ শুরু করা, আর খরচ সাত গুণ বাড়িয়ে দেওয়া—সব মিলিয়ে রাজউক যেন জবাবদিহিতার সংকটে নিমজ্জিত একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রতিবেদনের আলোকে বলা যায়—৩০ লাখ টাকার কাজ দুই কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকে গেল, যে কাজ পুরোপুরি নিয়মানুগ হওয়ার কথা ছিল, তা হয়ে উঠল স্বার্থসিদ্ধি ও নিয়মবহির্ভূতের প্রতীক।
