
বিশেষ প্রতিবেদকঃ দেশের পরিচিত ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বায়োফার্মা লিমিটেড-কে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং বিদেশে টাকা পাচারের গুরুতর অভিযোগ ঘুরপাক খাচ্ছে। উচ্চ আদালত তদন্তের নির্দেশ বহাল রাখার পরও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। অভিযোগের কেন্দ্রে থাকা উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লকিয়তুল্লাহ এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাগালের বাইরে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
গত বছর প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী-এর নেতৃত্বে আপিল বিভাগের বেঞ্চ হাইকোর্টের অনুসন্ধান সংক্রান্ত আদেশ বহাল রাখেন। কোম্পানির পক্ষ থেকে করা লিভ টু আপিল খারিজ করে দিয়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেন, অভিযোগ তদন্তে কোনো স্থগিতাদেশ নেই। ফলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)-এর সামনে তদন্ত চালিয়ে যাওয়ার আইনি বাধা ছিল না। তারপরও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
অভিযোগের সূত্রপাত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ভিত্তিতে করা রিট আবেদন থেকে। প্রাথমিক শুনানি শেষে হাইকোর্ট সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে রুল জারি করেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দিতে দুদক ও এনবিআর চেয়ারম্যানকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসচিব, অর্থসচিব, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং কোম্পানির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের জবাব দিতে বলা হয়।
কোম্পানির ভেতরে গঠিত পাঁচটি তদন্ত কমিটির ৪০৫ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকার অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে আসে। সেখানে অভিযোগ করা হয়, কাগুজে ও সহযোগী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ‘বায়োফার্মা ফাউন্ডেশন’ ও ‘গোল্ড ট্রেডিং কোম্পানি’সহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। বিক্রির পরিমাণ কম দেখিয়ে রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগও আছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবহার করে বিদেশে সম্পদ গড়ার কথাও আলোচনায় এসেছে।
শেয়ারহোল্ডারদের দাবি, গত ২২ বছরে কোনো লভ্যাংশ দেওয়া হয়নি। প্রায় ১৫ বছর নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভাও হয়নি। অথচ পরিচালনা পর্ষদের কয়েকজন সদস্যের বিদেশে সম্পদ বৃদ্ধির তথ্য সামনে আসায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়েছে।
১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি ১৯৯৯ সালে নতুন মালিকানায় যায় এবং পরে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। সাবেক চেয়ারম্যান এন এ কামরুল হাসান বর্তমানে বিদেশে অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে। বর্তমান চেয়ারম্যান নাছিমা বেগম ঝুমুর। ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্বে আছেন ডা. আনোয়ারুল আজিম এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. মিজানুর রহমান। অভিযোগকারীরা বলছেন, কাগজে উপব্যবস্থাপনা পরিচালক হলেও ডা. লকিয়তুল্লাহ কার্যত প্রতিষ্ঠানের মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন। আর্থিক লেনদেন, বিনিয়োগ ও নতুন সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠনে তার একক প্রভাব ছিল।
এদিকে কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান ডা. সওকাত আলী লস্করের মৃত্যুকে ঘিরে দায়ের করা হত্যা মামলাও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। পরিবারের অভিযোগ, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতি খতিয়ে দেখতে শুরু করলে হুমকি পেতে থাকেন। পরবর্তীতে অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করলে তার মৃত্যুকে ঘিরে সন্দেহ দেখা দেয়। মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে ডা. লকিয়তুল্লাহকে। ভাইস চেয়ারম্যান ডা. আনোয়ারুল আজিমসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মামলাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা হয়েছে। মামলাটি বর্তমানে বিচারাধীন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংক লেনদেন, আর্থিক নথি ও বিদেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছে। তবে তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশ বহাল থাকার পর তদন্তে দৃশ্যমান গতি প্রত্যাশিত ছিল।
সব মিলিয়ে, আদালতের স্পষ্ট নির্দেশ, অভ্যন্তরীণ তদন্তে শত শত কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ এবং হত্যা মামলার মতো গুরুতর বিষয় সামনে আসার পরও মূল অভিযুক্তদের অবস্থান ও তদন্তের ধীরগতির কারণে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির সুনাম ও শেয়ারহোল্ডারদের আস্থা ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
