
পিরোজপুর প্রতিনিধিঃ পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার সেখ মাটিয়া ইউনিয়নে সরকারি সার ও কৃষি উপকরণের ডিলারশিপ নিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত জুলাই-আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত ডিলার অনুপস্থিত থাকলেও তার নামে হুমায়ুন কবির (টুটুল) নামের এক ব্যাক্তি অবৈধভাবে ডিলারশিপ পরিচালনা করছেন। এই অনিয়মে সরাসরি সহযোগিতা করছেন ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম সাফিক। আর এই অবৈধ কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চলতে পারছে উপজেলা কৃষি অফিসার এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসারের (ইউএনও) নীরব সমর্থনে।
ডিলার নেই, ব্যবসা চলছে পুরোদমে :
স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রঘুনাথপুর খেজুরতলা বাজারে অবস্থিত রিফাত এন্টারপ্রাইজ নামক সার ডিলারশিপের মালিক সালাউদ্দিন রিন্টু, যিনি পূর্বে ০৭ নং শেখমাটিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং পরবর্তীতে ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। গণঅভ্যুত্থানের সময় সেখ মাটিয়া ইউনিয়নের সরকারি ডিলার নিরাপত্তার কারণে এলাকা ছেড়ে চলে যান, তারপর থেকে আর ফিরে আসেননি। এছাড়া স্থানীয় এবং থানা সুত্রে জানা যায় তিনি বর্তমানে ঢাকার একটি বিস্ফোনক মামলায় কারাগারে আছেন। যার দ্বারা প্রমাণ হয় যে তিনি এখন সম্পূর্ণ অনুপস্থিত এবং তিনি বর্তমানে ডিলারশিপের দায়িত্ব পালন করছেন না।
কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, ওই ডিলারের নামেই হুমায়ূন কবির (টুটুল) নামের অন্য একজন ব্যক্তি দোকান পরিচালনা করছেন এবং সার ও কৃষি উপকরণের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই অবৈধ কার্যক্রম চলছে প্রায় এক বছর দুই মাস ধরে, প্রশাসনের চোখের সামনেই।
বিএনপি নেতার সরাসরি সংযুক্ততা:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই অবৈধ ডিলারশিপ পরিচালনায় মূল ভূমিকা রেখেছেন সেখ মাটিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম সাফিক। তিনি অনুপস্থিত ডিলারের নামে নতুন ব্যক্তিকে দোকান পরিচালনায় সহযোগিতা করেছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে এই বিষয়ে টাকা লেনদেন এর মাধ্যমে তাদেরকে পূর্ণ সহযোগিতা করছে ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শফিকুল ইসলাম সাফিক (সাবেক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান – তৌহিদুল ইসলাম এর ছোট ভাই)। স্থানীয় এবং নাজিরপুর থানা সূত্রে জানা গেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে শফিকুল ইসলাম সাফিক এবং তার মেজ ভাই মোজাহিদুল ইসলাম এর নামে একাধিক চাঁদাবাজির ও মামলা বানিজ্যের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় একজন কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “শফিকুল ইসলাম সাফিকের মাধ্যমে এই অবৈধ ব্যবসা চলছে। আসল ডিলার নেই, কিন্তু তার নাম এবং ডিলারশিপ ব্যাবহার করে হুমায়ুন কবির (টুটুল) সার বিক্রি করছে। এটা সবাই জানে, কিন্তু কেউ কিছু বলতে পারছে না।”
আরেক জনপ্রতিনিধি অভিযোগ করেন, “এটা স্পষ্ট দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার। একজন রাজনৈতিক নেতা কীভাবে সরকারি ডিলারশিপ নিয়ে এভাবে খেলতে পারেন?”
কৃষি অফিসারের দায়িত্বহীনতা নাকি দুর্নীতি?
সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে নাজিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসারের ভূমিকা নিয়ে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ডিলার অনুপস্থিত থাকলে বা দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে তাৎক্ষণিকভাবে তার লাইসেন্স বাতিল করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়ার কথা। কিন্তু সেখ মাটিয়ার ক্ষেত্রে তা করা হয়নি।
বরং কৃষি অফিসার এই অবৈধ ডিলারশিপ পরিচালনায় ধারাবাহিক সহযোগিতা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনুপস্থিত ডিলারের নামে অন্য ব্যক্তি হুমায়ূন কবির (টুটুল) কে সার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা স্পষ্টতই নিয়মবহির্ভূত এবং অনৈতিক।
স্থানীয় কৃষকেরা বলেন, “কৃষি অফিসার জানেন না যে আসল ডিলার নেই? তাহলে কেন নতুন ডিলার নিয়োগ দিচ্ছেন না? আর যে ব্যক্তি দোকান চালাচ্ছে, তাকে সার কে দিচ্ছে? এসব প্রশ্নের উত্তর কৃষি অফিসারকে দিতে হবে।”
ইউএনও’র নীরবতা: প্রশাসনিক ব্যর্থতা নাকি যোগসাজশ?
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে নাজিরপুর উপজেলার সামগ্রিক প্রশাসনিক তদারকির দায়িত্ব তার উপর। কিন্তু এই গুরুতর অনিয়মের বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ নীরব থেকেছেন।
প্রশ্ন উঠেছে, একজন রাজনৈতিক নেতার সহযোগিতায় অবৈধভাবে সরকারি ডিলারশিপ পরিচালিত হচ্ছে, অথচ ইউএনও কেন কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না? তিনি কি এই অনিয়ম সম্পর্কে অবগত নন, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে চোখ বন্ধ করে আছেন?
স্থানীয় সাংবাদিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, “ইউএনও’র এই নীরবতা প্রশাসনিক দায়িত্বহীনতার চরম উদাহরণ। তিনি হয় অযোগ্য, নয়তো এই দুর্নীতিতে সংশ্লিষ্ট।”
নিয়ম লঙ্ঘন ও জনস্বার্থ ক্ষুন্ন :
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী:
১. ডিলার ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসা পরিচালনা করবেন, অন্য কাউকে দিয়ে পরিচালনা করা যাবে না।
২. ডিলার অনুপস্থিত থাকলে বা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে তার লাইসেন্স বাতিল করতে হবে।
৩. নতুন ডিলার নিয়োগে স্বচ্ছতা ও জনপ্রতিনিধিদের সুপারিশ থাকতে হবে।
কিন্তু সেখ মাটিয়ার ক্ষেত্রে এই তিনটি নিয়মই লঙ্ঘন করা হচ্ছে। ফলে কৃষকরা সঠিক সেবা পাচ্ছেন না এবং সরকারি ভর্তুকির অপব্যবহার হচ্ছে।
কৃষকদের ক্ষোভ ও দাবি:
সেখ মাটিয়া ইউনিয়নের কৃষকরা এই অনিয়মের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন এবং দাবি করেছেন:
১। অবিলম্বে অবৈধ ডিলারশিপ বন্ধ করতে হবে এবং আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে।
২। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় নতুন ডিলার নিয়োগ দিতে হবে।
৩। এই অনিয়মে জড়িত বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম সাফিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪। উপজেলা কৃষি অফিসার এবং ইউএনও’র বিরুদ্ধে তদন্ত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
৫। গত দুই মাসে এই অবৈধ ডিলারশিপের মাধ্যমে যে সার বিক্রি হয়েছে, তার হিসাব প্রকাশ করতে হবে।
প্রশাসনের নীরবতা অব্যাহত:
এ বিষয়ে নাজিরপুর উপজেলা কৃষি অফিসার ইশরাতুন্নেছা এশার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান এ বিষয়ে আমি এবং আমার কার্যালয় অবহিত নয়। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত কোন লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি। অভিযোগ দায়ের হলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব।
তবে সার ডিলার / গোডাউন পরিদর্শন নীতিমালা ২০২০ অনুযায়ী, মাসে অন্তত একবার ইউনিয়ন সার ডিলার / গোডাউন পরিদর্শন, গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমে মাসে কমপক্ষে দুইবার পরিদর্শনের কথা থাকলেও উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর এ বিষয়ে কোন ভ্রুক্ষেপ করেননি।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে একটি ইউনিয়নের ডিলার অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তার ডিলারশিপ ব্যবহার করে ব্যবসা পরিচালিত হয়ে আসছে। অথচ এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তরের কাছে কোনো তথ্য-উপাত্ত নেই। যা উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদারকি ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে। এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজিয়া শাহনাজ তমার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান এ বিষয়ে আমার কিছুই জানা নেই এবং এ বিষয়ের সমস্ত দায়ভার উপজেলা কৃষি অফিসারের।
অন্যদিকে, বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম সাফিককে ফোন করা হলে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বলেন, “আমি শুধু কৃষকদের সেবা করছি। এখানে কোনো অনিয়ম নেই।” তবে তিনি কীভাবে ডিলার অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও ওই নামে ব্যবসা চলছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর দিতে ব্যর্থ হন।
দুর্নীতির জাল: রাজনীতি ও প্রশাসনের যোগসাজশ:
বিশ্লেষকরা বলছেন, সেখ মাটিয়ার এই ঘটনা প্রমাণ করে যে গণঅভ্যুত্থানের পরও মাঠ পর্যায়ে দুর্নীতি ও অনিয়ম অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনিক যোগসাজশের মাধ্যমে সরকারি সুবিধা লুটপাট হচ্ছে।
একজন কৃষিবিদ বলেন, “এটা শুধু একটি ডিলারশিপের সমস্যা নয়, এটা একটা সিস্টেমেটিক দুর্নীতি। যেখানে রাজনৈতিক নেতা, কৃষি অফিসার এবং ইউএনও সবাই জড়িত। এই চক্র ভাঙতে না পারলে কৃষকরা কখনোই ন্যায্য সেবা পাবেন না।”
উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরি:
জেলা প্রশাসক, আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিকর্তা এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ে এই বিষয়ে তদন্ত ও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক, জনপ্রতিনিধি এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
তারা বলেছেন, “গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম একটা পরিচ্ছন্ন প্রশাসনের। কিন্তু সেখ মাটিয়ায় যা ঘটছে, তা আমাদের সেই স্বপ্নে আঘাত করছে। আমরা চাই, এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক।”
প্রতিবেদকের পর্যবেক্ষণ:
সরেজমিনে সেখ মাটিয়া ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকৃতই একটি দোকানে সার ও কৃষি উপকরণ বিক্রি হচ্ছে পুরনো ডিলারের নামে। স্থানীয়রা নিশ্চিত করেছেন যে আসল ডিলার এক বছর দুই মাস ধরে এলাকায় নেই, এবং তিনি ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময় থেকে পলাতক থাকার পর বর্তমানে ঢাকার একটি বিস্ফোনক মামলায় কারাগারে আছেন। দোকান যে ব্যক্তি পরিচালনা করছেন, তিনি নিজেকে “মালিক” বলে পরিচয় দিয়েছেন, তবে তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত মালিক / ডিলান নন। এই পুরো বিষয়টি প্রমাণ করে যে নাজিরপুর উপজেলা প্রশাসনে গুরুতর দায়িত্বহীনতা এবং সম্ভাব্য দুর্নীতি বিরাজমান।
নোট: এই প্রতিবেদনে উল্লেখিত সকল অভিযোগ স্থানীয় সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী এবং সরেজমিন পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে। আমরা আশা করি, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত করে এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন এবং কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করবেন।
