
আন্তর্জাতিক ডেস্ক :পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে দ্বৈত নীতি ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বিশ্বাসযোগ্যতা ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করছে বলে সতর্ক করেছেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট চার্লস মিশেল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তুষ্ট করার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও জোরালো ও স্বাধীন পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
শুক্রবার গ্রিসের এথেন্সে অনুষ্ঠিত ডেলফি ইকোনমিক ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এই সতর্কবার্তা দেন। মিশেল জানান, ইইউ নীতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে অসঙ্গতি বিশ্বমঞ্চে এই জোটের কর্তৃত্ব দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি করছে।
তিনি বলেন, ‘দ্বৈত নীতি এমন একটি ধাঁধা, যা ইউরোপের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং কর্তৃত্বকে ক্ষুণ্ন করে। সত্যি বলতে, মাঝে মাঝে আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তুষ্ট করার একটা প্রবণতা রয়েছে। এবং বাকি বিশ্বের প্রতি এক ধরনের অহংকারী আচরণ করা হচ্ছে।’
আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আরও জোরালো এবং বিশ্বাসযোগ্য দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন মিশেল। তিনি সতর্ক করে বলেন, নিয়মভিত্তিক নীতি মেনে চলে না—এমন অংশীদারদের প্রতি অস্পষ্ট অবস্থান ইইউর ‘সফট পাওয়ার’ ও গ্রহণযোগ্যতার ক্ষতি করে।
প্রতিরক্ষা বিষয়ে মিশেল জানান, ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তিকে শক্তিশালী করতে ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে নিরাপত্তা নীতি প্রণয়নে নেতৃত্ব দিতে হবে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্প ভিত্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করতে চাই, তবে কিছু স্পষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া তা সম্ভব নয়। আমাদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর নেওয়া কিছু সিদ্ধান্ত আমরা দেখেছি। ইউরোপীয় প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে যাদের ঐতিহ্য রয়েছে, তাদের নিয়েই এই অগ্রগতি সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার মতে, এটি কেবল ইইউর বিষয় নয়, এটি পুরো ইউরোপ মহাদেশের বিষয়। এর অর্থ হলো—যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, তুরস্ক এবং ইউক্রেনের সঙ্গে নিঃসন্দেহে একটি যৌথ সহযোগিতা।’
সংকটকালীন সময়ে দ্রুত সমন্বয় সাধন এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও শিল্পের জন্য কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিতে একটি উচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক ফোরাম হিসেবে ‘ইউরোপীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন মিশেল।
চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তিনি জানান, ইইউর উচিত আরও স্বাধীন দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা। বেইজিংয়ের সঙ্গে লেনদেনের ক্ষেত্রে ইউরোপ প্রায়শই নিজেকে ওয়াশিংটনের ‘হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করার সুযোগ দিয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
তিনি যুক্তি দেন, ইউরোপকে তার নিজস্ব স্বার্থ নির্ধারণ করতে হবে এবং সম্পৃক্ততার সঙ্গে প্রতিযোগিতার ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো সম্ভাব্য চুক্তি বা উত্তেজনা দেখা দিলে ইউরোপের অগ্রাধিকারগুলো উপেক্ষিত হতে পারে বলেও তিনি সতর্ক করেন।
অতীতের বিভিন্ন নির্ভরতার কথা উল্লেখ করে মিশেল বলেন, রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানি, চীনের উৎপাদন ব্যবস্থা এবং ন্যাটোর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন নিরাপত্তার ওপর নির্ভরশীলতার মডেল আর ইউরোপের জন্য টেকসই নয়।
তিনি বলেন, ‘এই মডেলের অবসান ঘটেছে এবং আমাদের এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে হবে। আমাদের আরও কৌশলী হতে হবে। আমরা জানি আমাদের কী করতে হবে। চলুন কাজ শুরু করি এবং দ্রুত কাজ করি।’
