
বিশেষ প্রতিবেদকঃ বিদ্যুৎখাতের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা রুরাল পাওয়ার কোম্পানী লিমিটেডে (আরপিসিএল) এমডি পদে নিয়োগ পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করার পরও ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অযোগ্য ও অদক্ষ প্রকৌশলী এএইচএম রাশেদকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এমডি হিসেবে এএইচএম রাশেদের অবৈধ নিয়োগে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তারই ঘনিষ্ঠ বন্ধু আরপিসিএল’র বর্তমান নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) রেজাউল কবীর, জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ) শাহজাহান ফকির এবং বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের সদস্য (অর্থ) নাজমুস সায়াদাত্।
সূত্র জানায়, উপরোক্ত ৩ জন সুচতুর কর্মকর্তা নিজেদের স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যে অবৈধপন্থায় মোটা অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করে অযোগ্য ও অদক্ষ প্রকৌশলী এএইচএম রাশেদকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফাওজুল কবীরকে ম্যানেজ করে ফেলেন।
সূত্র জানায়, মোটা অঙ্কের ঘুষের এই টাকা মূলত ময়মনসিংহে নির্মাণাধীন ৩৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ঠিকাদার হারবিন ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে প্রকল্প পরিচালক রেজাউল কবীর ও শাহজাহান ফকির সংগ্রহ করেন। যে কারণে হারবিন ইঞ্জিনিয়ারিংকে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয়। উক্ত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্টেপ আপ ট্রান্সফরমারটি (২৪০ এমভিএ, ১৩২ কেভি) নষ্ট অবস্থায় সরবরাহ করা হলেও ক্রয়কারী কর্তৃপক্ষ আরপিসিএল বোর্ডের কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আরইবি সদস্য (অর্থ) নাজমুস সায়াদাতের অনুমোদনক্রমে মেরামত করে পুনরায় সরবরাহের জন্য ঠিকাদারকে অবৈধ সুবিধা প্রদান করা হয়। আর এই প্রক্রিয়ায় প্রকল্প পরিচালক রেজাউল কবীর ও শাহজাহান ফকির সরাসরি জড়িত বলে সূত্র জানায়।
বিনষ্ট ট্রান্সফরমার মেরামত করে পুনরায় সরবরাহ করার জন্য ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হারবিন ইঞ্জিনিয়ারিংকে অবৈধ সুবিধা দিয়ে বিপুল পরিমাণের অর্থ হাতিয়ে নেয় এই চক্রটি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি সাধন করে প্রকল্প পরিচালক রেজাউল কবীর ও জেনারেল ম্যানেজার শাহজাহান ফকির ঠিকাদারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করে অবৈধ পন্থায় ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে এএইচএম রাশেদকে নিয়োগ পেতে সর্বাত্মক সহযোগিতা করায় এর পুরস্কার হিসেবে আরেক অযোগ্য ও অদক্ষ তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী প্রকল্প পরিচালক রেজাউল কবীর প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি প্রদান করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, মাত্র ২ মাসের মাথায় প্রধান প্রকৌশলীর পদ থেকে নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) হিসেবে পদোন্নতি দেন সুচতুর এমডি এএইচএম রাশেদ। আর এতে ষোল কলা পূর্ণ হয় রেজাউল কবীরের। অন্যদিকে আরেক ধুরন্ধর কর্মকর্তা শাহজাহান ফকির জেনারেল ম্যানেজার পদের অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) বাগিয়ে নিতে সক্ষম হন।
সূত্র জানায়, উপরোক্ত ৩ কর্মকর্তা মিলে গিলে খাচ্ছে আরপিসিএল। অবৈধপন্থায় এএইচএম রাশেদ এমডি হিসেবে নিয়োগ পাওয়ায় প্রায় সকল ক্ষেত্রেই আরপিসিএল’র পারফরমেন্স কমতে থাকে। অন্যদিকে ভেঙ্গে পড়ে চেইন অব কমান্ড। সবমিলে স্থবিরতা নেমে এসেছে আরপিসিএল-এ। হতাশা বিরাজ করছে প্রতিষ্ঠানে কর্মরত সচেতন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মাঝে। আরপিসিএল’র প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে জানান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএইচএম রাশেদের কক্ষে রেজাউল কবীর ও শাহজাহান ফকির ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দেওয়ার ফলে আরপিসিএল’র অঙ্গ প্রতিষ্ঠানসমূহের জরুরী কাজের জন্য নথী স্বাক্ষর করতে গেলে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। ফলশ্রুতিতে সকল কার্যক্রম ব্যাপক বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আরপিসিএল, আরএনপিএল ও বিপিইএমসি এই ৩টি প্রতিষ্ঠানের যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এমনকি কারিগরী বিষয়ের ক্ষেত্রেও ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) শাহজাহান ফকির এবং নাজমুস সায়াদাতের সঙ্গে পরামর্শ করার পর সিদ্ধান্ত নেন এমডি রাশেদ। যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এএইচএম রাশেদকে এমডি পদে বসানোর ফলে ঐ দু’জনের সঙ্গে পরামর্শ ছাড়া কোন কাজ করার সাহস কিংবা মনোবল নেই তার মধ্যে। আরএনপিএল এর ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়লা সরবরাহের জন্য বেআইনিভাবে একক দরপত্রের মাধ্যমে ‘পিটি সাম্পার’ নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে মিলিয়ন মিলিয়ন ডলারের কার্যাদেশ প্রদান করেন তৎকালিন ভারপ্রাপ্ত এমডি নাজমুস সায়াদাত। পরবর্তীতে উক্ত প্রতিষ্ঠান নিম্ন মানের কয়লা সাপ্লাই দেওয়াতে এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। উক্ত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘পিটি সাম্বার’ থেকে বর্তমান এমডি রাশেদ, শাহজাহান ফকির ও নাজমুস সায়াদাত প্রতি টন কয়লার জন্য নির্দিষ্ট হারে অবৈধ সুবিধা নিয়ে এই নিম্ন মানের কয়লা নিতে আরএনপিএলকে বাধ্য করে। যদিও খারাপ কয়লার কারণে প্রায় ৬ লাখ টন সরবরাহ করার পর বর্তমানে কয়লা সরবরাহ স্থগিত রাখা হয়েছে। উক্ত প্রক্রিয়ায় কোন নিয়মনীতি না মেনে নাজমুস সায়াদাতকে মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক করা হয় এবং ইউনুস সরকারের শেষের দিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে তড়িঘড়ি করে এই চুক্তি সম্পন্ন করা হয়। ময়মনসিংহ ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্রের গ্যাস টারবাইন-৪ বিনষ্ট হয়ে দীর্ঘ ১৪ মাস বন্ধ থাকে (মার্চ ২০২৫ থেকে মে/২০২৬ পর্যন্ত)। এতে করে আরপিসিএল’র প্রায় ১১০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। অথচ ঐ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্লান্ট ইনচার্জ ও বর্তমান এমডি রাশেদ ঐ ১৪ মাস দায়িত্বে ছিলেন। আরপিসিএল-এ দীর্ঘদিন ধরে প্রধান প্রকৌশলীর ২টি পদ শুন্য রেখে নিজের পছন্দের অযোগ্য ও অদক্ষ লোকজনকে দায়িত্ব দেওয়ায় আরপিসিএল’র কর্মকান্ডে ধ্বস নেমেছে। এতে করে ৪টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রই প্রায় বন্ধ রয়েছে বলে জানা গেছে। ময়মনসিংহ ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র দীর্ঘদিন যাবত বন্ধ রয়েছে।
গাজীপুর ১০৫ মেগাওয়াট, ৫২ মেগাওয়াট ও রাউজান ২৬ মেগাওয়াট এই ৩টি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে কেন সামর্থ অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না সে বিষয় খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করছেন সচেতনমহল। নির্বাহী পরিচালক (অর্থ) পদে নিয়োগের জন্য হত ৩০/১১/২০২৫ ইং তারিখের মধ্যে সার্কুলার দেওয়ায় সুস্পষ্টভাবে আরপিসিএল বোর্ডের সিদ্ধান্ত থাকলেও এখন পর্যন্ত সার্কুলার না দিয়ে শাহজাহান ফকিরকে অতিরিক্ত দায়িত্বে রাখা হয়েছে।
অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে, শাহজাহান ফকিরের যোগ্যতা না থাকায় এই সার্কুলার দেওয়া হচ্ছে না। কারণ হিসেবে জানা গেছে, শাহজাহান ফকির সান্ধ্যকালীন এমবিএ (একাউন্টিং) কোর্সে ভর্তি হয়েছেন। পাশ করতে যতদিন দরকার হয় ততদিন সার্কুলার না দিয়ে দায়িত্ব দিয়ে রাখা হয়। এতে সহযোগিতা করেন এমডি রাশেদ, নাজমুস সায়াদাত ও আরইবি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এসএম জিয়াউল আজীম। সম্প্রতি আরপিসিএল এর নির্বাহী প্রকৌশলী এবং উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নির্দিষ্ট কিছু প্রার্থীকে প্রশ্ন আউট করে দিয়ে সিনিয়ারিটি ভঙ্গ করে ইচ্ছেমতে বিশাল অঙ্কেও ঘুষের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়ায় আরপিসিএল’র প্রকৌশলীদের মধ্যে চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে।
উল্লেখ্য, নির্বাহী প্রকৌশলীর ৩টি পদ শূণ্য পদে ১:৩ অনুপাত হিসেবে ৯ জনকে পরীক্ষার জন্য ডেকে প্রশ্ন আউট করে সিনিয়ারিটি ভেঙ্গে অর্থের বিনিময়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়। আবার উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর পদে ৬টি পদের বিপরীতে ১:৩ অনুপাত না ডেকে ১:৪.২ অনুপাতে ২৬ জনকে পরীক্ষায় ডেকে প্রশ্ন আউট করে দিয়ে নিজেদের পছন্দের ও ঘুষের বিনিময়ে সিনিয়ারিটি ভেঙ্গে পদোন্নতি প্রদান করা হয়। এতে করে সিনিয়র প্রকৌশলীগণ পদোন্নতি বঞ্চিত হওয়ায় চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে। জানা গেছে, এ সকল নিয়োগ কমিটিতে নির্বাহী পরিচালক (পিএন্ডডি) নাঈমকে বাদ দিয়ে নির্বাহী পরিচালক (ওএন্ডএম) রেজাউল কবীরকে রাখা হয়। এর কারণ হচ্ছে তিনি এমডি রাশেদের বন্ধু। আরপিসিএল’র ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ কেন্দ্র সূত্রে জানা গেছে, রাশেদ ও রেজাউল কবীর ২ জনই ফ্যাসিস্ট সরকারের গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এদের ৩ জনের বাড়ীই ময়মনসিংহ শহরে।
ময়মনসিংহে নির্মাণাধীন ৩৬০ মেগাওয়াট কম্বাইড সাইকেল বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও মাদারগঞ্জে নির্মাণাধীন ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ প্রায় ২ বছর বিলম্ব হওয়ায় আরপিসিএল আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ফেরদৌসকে শাস্তি দেওয়া হলেও ৩৬০ মেগাওয়াট এর প্রকল্প পরিচালক রেজাউল কবীরকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী এবং ২ মাসের মাথায় নির্বাহী পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, অর্থ মন্ত্রণালয় ও বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে কৃচ্ছতা সাধনের জন্য সুষ্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও ৪টি নতুন পাজেরো জীপ ক্রয় করে ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক এবং জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ) শাহজাহান ফকির ব্যবহার করছেন। এমনকি ব্যক্তিগত কাজেও ইচ্ছেমতো ব্যবহার করছেন। শাহজাহান ফকিরকে আরপিসিএল’র সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান বিপিইএমসি-তে দীর্ঘদিন ধরে সিএফও এর অতিরিক্ত দায়িত্বে রাখা হয়। প্রায় ৬ বছর যাবতই তিনি অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। অথচ ঐ কোম্পানীতে গত যাবৎ কোন কাজ কর্ম নেই। শুধু মাত্র ‘সেনজেন স্টার’ এর সাথে মিলেমিশে অর্থ নয় ছয় করার জন্যই শাহজাহান ফকির কোনভাবেই দায়িত্ব ছাড়তে রাজী নয়। এ জন্য তার ভাষায় শাহজাহান ফকির আরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল এসএম জিয়াউল আজীম ও বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সবুর হোসেনকে তার সঙ্গে চায়না নিয়ে ম্যানেজ করেন।
বর্তমানে শাহজাহান ফকির আরপিসিএল, আরএনপিএল ও বিপিইএমসি’র অলিখিত কর্ণধার। সুতরাং ব্যবস্থাপনা পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক ও প্রকৌশলীরাও জেনারেল ম্যানেজার (অর্থ) শাহজাহান ফকিরের পরামর্শ নিয়ে কারিগরি দিকসহ সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছেন। সবমিলে উপরোক্ত সিন্ডিকেটটি গিলে খাচ্ছে আরপিসিএল।
