
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারকারী দেশগুলোর কাতারে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মিত দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরের প্রথম ইউনিটে পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং ও স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরু হওয়ার মধ্য দিয়ে দেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল পারমাণবিক জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু হয়। এর আগে প্রথম ইউনিটের জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) কমিশনিং লাইসেন্স দেয়। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রক সংস্থার পর্যালোচনা ও কারিগরি যাচাইয়ের ভিত্তিতে এই অনুমোদন দেওয়া হয়।
জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়ার পর ১২ মে প্রথম ইউনিটের রিঅ্যাক্টর কোরে ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর রিঅ্যাক্টরকে ধাপে ধাপে স্টার্টআপ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রমের দিকে নেওয়া হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ থেকে কমিশনিং পর্যায়ে প্রবেশ করে।
দুই ইউনিটে উৎপাদন হবে ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ইউনিট রয়েছে। প্রতিটি ইউনিটের উৎপাদনক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। দুটি ইউনিট চালু হলে কেন্দ্রটি মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করবে। প্রকল্পে রাশিয়ার ভিভিইআর-১২০০ প্রযুক্তির দুটি রিঅ্যাক্টর স্থাপন করা হচ্ছে।
প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়ার পর বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা, নিরাপত্তা যাচাই এবং কমিশনিং কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে এগোচ্ছে প্রকল্পটি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পরিকল্পনা অনুযায়ী, উৎপাদন শুরু হওয়ার পর ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ বাড়ানো হবে।
বাংলাদেশের জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস, তেল ও কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভরশীল। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হলে জাতীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনে একটি নতুন উৎস যুক্ত হবে। একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ তুলনামূলক কম কার্বন নিঃসরণকারী পারমাণবিক প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হবে।
বিশ্ব পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশগুলোর তালিকায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে রূপপুর প্রকল্পই মূল ভূমিকা রাখছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরুর ঘটনাকে দেশের জ্বালানি খাতে ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্মাণ থেকে উৎপাদনের পথে
রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। দ্বিতীয় ইউনিটের নির্মাণ শুরু হয় ২০১৮ সালে। দীর্ঘ নির্মাণ, যন্ত্রপাতি স্থাপন, পরীক্ষা ও নিয়ন্ত্রক যাচাই শেষে প্রথম ইউনিট এখন কমিশনিং ও স্টার্টআপ পর্যায়ে রয়েছে।
প্রকল্পটির বাস্তবায়নে রাশিয়ার কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতা রয়েছে। রোসাটম প্রকল্পটির সাধারণ নকশাকার ও প্রধান ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে। রূপপুরের দুটি ইউনিটে ব্যবহৃত ভিভিইআর-১২০০ রিঅ্যাক্টর প্রযুক্তিকে তৃতীয় প্রজন্মের উন্নত পারমাণবিক প্রযুক্তি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
এদিকে প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং ও পরবর্তী কমিশনিং কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করার পর জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়েছিল, ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং, রিঅ্যাক্টর স্টার্টআপ এবং কমিশনিংয়ের ধারাবাহিক ধাপ পেরিয়ে এখন দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়ার অপেক্ষা। সফলভাবে এই ধাপগুলো সম্পন্ন হলে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় যুক্ত হবে নতুন ও বড় একটি পারমাণবিক শক্তির উৎস।
