
ক্রীড়া ডেস্কঃ রাজনৈতিক বৈরীতার কারণে বেশ কয়েক বছর ধরে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। এর প্রভাব উভয় দেশের ক্রিকেটেও। দীর্ঘদিন ধরে দ্বিপাক্ষিক সিরিজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। এমনকি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে উভয় দলের ক্রিকেটাররা সৌজন্য হিসেবে হ্যান্ডশেক করছেন না। এমন পরিস্থিতিতে নতুন করে আরও একটি বিতর্ক সামনে এলো।
আগামী বছরের পাকিস্তানের ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ পিএসএলের পরবর্তী আসর এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একই সময়ে আইপিএল শুরু হতে যাচ্ছে। পাকিস্তানের ক্রিকেট সাংবাদিক সোহেল ইমরানের মতে, পিসিবি এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা টুর্নামেন্টের দ্বাদশ আসরের জন্য এই সময়টিকেই বেছে নেওয়ার পক্ষে মত দিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক মৌসুমে ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টটি প্রথাগত ফেব্রুয়ারি-মার্চের সময়সূচি থেকে সরে এসেছে। স্কুল ছুটির কারণে ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকরা এপ্রিল-মে মাসকে পছন্দ করলেও, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে টুর্নামেন্ট আয়োজনের পক্ষে জোর দিয়ে আসছে। এতে আইপিএল-এর সাথে প্রতিযোগিতা এড়ানো এবং বিজ্ঞাপন ও দর্শকসংখ্যা থেকে প্রাপ্ত আয় সুরক্ষিত রাখা হবে বলে জানান তারা।
সোহেল ইমরান জানিয়েছেন, পাকিস্তান সুপার লিগের আগের দুটি মৌসুমের মতো এবারও এপ্রিল-মে মাসেই টুর্নামেন্টটি আয়োজনের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সময়সূচি নিয়ে পিসিবি, ফ্র্যাঞ্চাইজি এবং মিডিয়া স্বত্বাধিকারীদের মধ্যে আলোচনা চলছে, যেখানে সম্প্রচারকারীরা আগামী বছরে শুরুতে টুর্নামেন্টটি শুরুর পক্ষে মত দিচ্ছে।
সোহেল ইমরান বলেন, পাকিস্তান সুপার লিগের দ্বাদশ মৌসুমটিও সেই একই সময়ে অনুষ্ঠিত হবে, যখন আগের দুটি মৌসুম হয়েছিল। এপ্রিল-মে মাসের সময়সূচিটি ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকদের সমর্থনপুষ্ট এবং এটি স্কুল ছুটির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও, এর ফলে লিগটি সরাসরি আইপিএল-এর সাথে একই সময়ে পড়ে যাবে।
এছাড়া এর ফলে খেলোয়াড়দের পাকিস্তানের তীব্র গ্রীষ্মকালীন গরমের মধ্যে খেলতে হবে। জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি সময়ের বিষয়টি বেছে নিলে আইপিএল-এর সাথে সময়সূচির সংঘাত এড়ানো সম্ভব হতো এবং সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে বিজ্ঞাপন ও টেলিভিশন থেকে আয় পুনরুদ্ধার করা সহজ হতো। তবে এই সময়সূচি অস্ট্রেলিয়ার ‘বিগ ব্যাশ লিগ’ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ‘এসএ২০’-এর সাথেও মিলে যায়, যা বিদেশি খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করকে।
২০১৬ সালে উদ্বোধনী আসর থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) প্রথাগতভাবে ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হতো। আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি আয়োজনের দায়িত্ব পালনের সুবিধার্থে পিসিবি গত বছরে আসরটি এপ্রিল-মে মাসে সরিয়ে নেয়, যার ফলে আইপিএল-এর সাথে এর সরাসরি সময়সূচি-সংঘাত তৈরি হয়। চলতি বছরেও পিসিএল একই সময়ে অনুষ্ঠিত হয়, কারণ বছরের শুরুর দিকটি আইসিসি পুরুষ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্য নির্ধারিত ছিল। অনেক আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় পিএসএল-এর বদলে আইপিএল-এ খেলার সিদ্ধান্ত নেন; আবার আইপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোও মৌসুম চলাকালীন বিকল্প খেলোয়াড় হিসেবে পিএসএল দলগুলো থেকে খেলোয়াড়দের দলে ভেড়ায়।
পিএসএল-এর প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি বা চুক্তি থেকে সরে আসা খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে পিসিবি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পেশোয়ার জালমি ছেড়ে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে যোগ দেওয়ায় করবিন বশকে এক বছরের জন্য পিএসএল থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। একইভাবে, ইসলামাবাদ ইউনাইটেড ছেড়ে কলকাতা নাইট রাইডার্সে যোগ দেওয়ায় জিম্বাবুয়ের পেসার ব্লেসিং মুজারাবানিকে দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
শ্রীলঙ্কান অলরাউন্ডার দাসুন শানাকাকেও পিএসএল-এর চুক্তি থেকে সরে এসে রাজস্থান রয়্যালসের হয়ে খেলার সিদ্ধান্তের কারণে এক বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা হয়।
এপ্রিল-মে মাসের সময়সূচি পাকিস্তান সুপার লিগের জন্য বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জও তৈরি করেছে। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি বাজারের বিশাল অংশের দখল ধরে রাখা আইপিএল-এর সাথে প্রতিযোগিতার মুখে মিডিয়া স্বত্বাধিকারীদের জন্য বিজ্ঞাপন থেকে আয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
খবর অনুযায়ী, একটি প্রধান স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান পিসিবি-র পাওনা প্রায় ৪৫০ কোটি (৪.৫ বিলিয়ন) পাকিস্তানি রুপি পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে। এই আর্থিক চাপের কারণে বোর্ড ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর কেন্দ্রীয় আয়ের তহবিল থেকে সাময়িকভাবে প্রায় ৪০-৪৫ কোটি রুপি আটকে রাখে, যা পিসিবি ও দলের মালিকদের মধ্যে আইনি বিরোধের জন্ম দেয়।
আর্থিক জটিলতা সত্ত্বেও, সময়সূচির এই পরিবর্তন লিগটিকে কাঠামোগত সংস্কারের দিকেও ধাবিত করেছে। প্রতিযোগিতাটি তার প্রথাগত ‘প্লেয়ার ড্রাফট’ পদ্ধতি থেকে সরে এসে ‘নিলাম’ (অকশন) ব্যবস্থা চালু করেছে, যা ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে খেলোয়াড় সংগ্রহের কৌশলে আরও বেশি নমনীয়তা প্রদান করেছে।
দলগুলোকে সাধারণ বেতনের সীমার বাইরে একজন ‘মার্কি’ খেলোয়াড় দলে ভেড়ানোর অনুমতিও দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া শিয়ালকোট ও হায়দ্রাবাদের প্রতিনিধিত্বকারী ফ্র্যাঞ্চাইজি যুক্ত করার পরিকল্পনার মাধ্যমে লিগটি আট-দলের কাঠামোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
