
বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্বৈরাচারী আওয়ামী শাসনামলে গণপূর্ত অধিদপ্তরে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ, সিনিয়রিটি বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। বিশেষ করে নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাহাঙ্গীর আলমকে ঘিরে নতুন করে তীব্র আলোচনা শুরু হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নিয়মিত বিসিএস পদ্ধতি এড়িয়ে বিশেষ সুবিধায় তাকে সরাসরি ৬ষ্ঠ গ্রেডে উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমানে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও শত শত কোটি টাকার টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জানা গেছে, গণপূর্ত অধিদপ্তরে সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী বিসিএসের মাধ্যমে ৯ম গ্রেডে সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগ দেওয়ার বিধান থাকলেও একটি প্রভাবশালী চক্র সেই নিয়ম ভেঙে কয়েকজনকে সরাসরি উচ্চ পদে বসানোর ব্যবস্থা করে। এই তালিকায় ছিলেন মোঃ জাহাঙ্গীর আলম, সমীরণ মিস্ত্রী, জিয়াউর রহমান ও মোঃ আবু তালেবসহ আরও কয়েকজন। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়া এবং সাবেক এমপি শেখ সেলিম ও শেখ হেলালের প্রভাবেই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়।
অভিযোগ আরও গুরুতর হয়ে ওঠে যখন দাবি করা হয়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নাকি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান এটিএম আহমেদুল হককে সরাসরি নির্দেশ দেন যাতে লিখিত বা প্রিলিমিনারি পরীক্ষা ছাড়াই নির্ধারিত প্রার্থীদের নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে শুধু আনুষ্ঠানিক ভাইভা নিয়ে ১১ জনকে চাকরি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিসিএস ক্যাডারের একাংশ আদালতের শরণাপন্ন হলে হাইকোর্ট ১৭টি পদ বিসিএস কর্মকর্তাদের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। কিন্তু সেই নির্দেশ কার্যত উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শুধু চাকরিতে বহালই রাখা হয়নি, বিতর্কিতভাবে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের অনেককে সিনিয়রিটিতেও এগিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে চাকরিতে যোগদান ও বেতন উত্তোলন নিয়ে। অভিযোগ অনুযায়ী, আদালতের স্থগিতাদেশ চলাকালে প্রায় ১১ মাসের ব্যাকডেট দেখিয়ে যোগদানপত্র তৈরি করা হয়। অথচ ওই সময় অনেকেই বাস্তবে চাকরিতে উপস্থিত ছিলেন না। এরপরও সরকারি কোষাগার থেকে বকেয়া বেতন উত্তোলন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। সূত্র বলছে, সেই সময় মোঃ জাহাঙ্গীর আলম বিআইডাব্লিউটিএতে সহকারী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং সেখান থেকে নিয়মিত বেতন নিচ্ছিলেন। একই সময়ে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকেও তিনি বেতন উত্তোলন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অর্থাৎ একই সময়ে দুই সরকারি প্রতিষ্ঠানের বেতন গ্রহণের মাধ্যমে সরকারি চাকরি বিধিমালা লঙ্ঘন ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সামনে এসেছে।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে আরও কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও। বলা হচ্ছে, মোঃ আইয়ুব আলী তখন মেরিন একাডেমিতে চাকরিতে ছিলেন এবং মোঃ নাফিজ আহমেদ রাজশাহীতে সরকারি চাকরিতে কর্মরত ছিলেন। এছাড়া কয়েকজন ব্যক্তি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলেও পরে ব্যাকডেট দেখিয়ে সরকারি চাকরিতে যোগদানের সুবিধা নেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব অনিয়মের পেছনে সাবেক সচিব শহীদ উল্লাহ খন্দকার, শেখ সেলিম, শেখ হেলাল এবং সাবেক প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ ভূইয়ার সরাসরি প্রভাব কাজ করেছে।
সম্প্রতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের “পি পি ডব্লিউ ডি উড ডিভিশন” নিয়েও নতুন করে নানা অভিযোগ উঠেছে। প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাঠ ও ফার্নিচার প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম একটি নির্দিষ্ট ইউনিটে পদায়নের জন্য প্রভাবশালী এক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীকে মোটা অঙ্কের ঘুষ দেন। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিপিপির আওতাধীন প্রকল্পকে দুই ভাগে ভাগ করে কমিশন নেওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া প্রধান প্রকৌশলীর সামনেই দুই পক্ষ থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আদায় করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রধান প্রকৌশলীর ভাই “মামুন”-এর নাম ব্যবহার করে বিভিন্ন ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা আদায়ের চেষ্টার কথাও শোনা যাচ্ছে। পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনায় নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাহাঙ্গীর আলম সক্রিয়ভাবে জড়িত বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
আরও অভিযোগ রয়েছে, হাতিল, পশ ফার্নিচার, রিগেল ফার্নিচার, আকতার ফার্নিচার ও ডট ফার্নিচারসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে বিভিন্ন কাজ ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। তদন্ত চলমান থাকার পরও কীভাবে তিনি প্রায় দেড়শ কোটি টাকার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী সরোয়ার জাহান বিপ্লব বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন অনেক আগেই দেওয়ার কথা ছিল। কেন সেটি জমা পড়েনি তা খতিয়ে দেখা হবে এবং দ্রুত রিপোর্ট দেওয়ার জন্য আবারও নির্দেশনা পাঠানো হবে।
এখন সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও শক্তিশালী সিন্ডিকেটের সহায়তা ছাড়া এত বিতর্কের পরও কীভাবে একজন কর্মকর্তা বছরের পর বছর গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করে যেতে পারেন। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণ মিললে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
