
ডেস্ক নিউজ : বিদেশে বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থান বাড়লেও শ্রমবাজারে কোনো বৈচিত্র্য আসেনি। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশেই আটকে আছে বাংলাদেশের শ্রমবাজার। গত বছর মোট কর্মী রপ্তানির দুই-তৃতীয়াংশই গেছে সৌদি আরবে। আর মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ-জিসিসিভুক্ত ছয় দেশে গেছে ৮১ শতাংশ কর্মী। যা বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের একক দেশ ও অঞ্চল নির্ভরতার চিত্রকেই ফুটিয়ে তুলছে।
এই নির্ভরতা দেশের শ্রমবাজারে চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। আঞ্চলিক সংঘাত, নীতি পরিবর্তন, ভিসা সীমিতকরণ কিংবা শ্রমবাজারে নতুন শর্ত আরোপ কর্মী রপ্তানির পুরো ব্যবস্থাকেই চাপে ফেলে। এজন্য বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজার তাগিদ দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তবে কর্মীদের কারিগরি ও ভাষাগত দক্ষতার অভাব বিকল্প শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৬৮ জনশক্তি বিদেশে গেছে। এর মধ্যে সৌদি আরবেই যায় ৭ লাখ ৫৫ হাজার ১৯৪ জন। যা বিদেশগামী মোট কর্মীর ৬৭ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কাতার দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও সেখানে গেছে মাত্র ১ লাখ ৭ হাজার ৬০২ জন। এরপর সিঙ্গাপুরে ৭০ হাজার ৮৩২, কুয়েতে ৪২ হাজার ৭৪৮ এবং মালদ্বীপে ৪০ হাজার ১৫৯ জন কর্মী গেছে। শীর্ষ পাঁচ গন্তব্যের মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতের অবস্থান শক্তিশালী।
চলতি বছরেও বাংলাদেশের শ্রমবাজারের চিত্র প্রায় একই। ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজার ৩৭০ জন কর্মী বিদেশে গেছে। এর মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই গেছে ২ লাখ ৯৭ হাজার ২৬৯ জন। এরপর সিঙ্গাপুরে ৫৫ হাজার ৯৫৯ জন, কাতারে ৪৭ হাজার ৯৮১ জন, মালদ্বীপে ২৪ হাজার ২৬০ জন এবং কুয়েতে গেছে ২০ হাজার ৪৩২ জন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ১৪১টি দেশে বাংলাদেশি কর্মী গেলেও প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মীই গেছে সৌদি আরব, কাতার, সিঙ্গাপুর, কুয়েত ও মালদ্বীপে। বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বড় অংশ উপসাগরীয় অঞ্চলনির্ভর। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৮১ শতাংশ কর্মী জিসিসিভুক্ত ছয় দেশ- সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও বাহরাইন গেছে। সে বছর মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৪৬ শতাংশ এসেছে এসব দেশ থেকে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে কোনো বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব শুধু কর্মসংস্থানে নয়, রেমিট্যান্স প্রবাহেও পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা শ্রমবাজারে চরম ঝুঁকি তৈরি করছে। সংশ্লিষ্ট দেশের নীতি পরিবর্তন, ভিসা সীমিত করলে কিংবা শ্রমবাজারে নতুন শর্ত আরোপ করলে কর্মী পাঠানোর পুরো ব্যবস্থাই চাপে পড়ে। চলতি বছরের শুরুতে সৌদি আরব কর্মী ভিসার যাচাইবাছাই কঠোর করে ফেলে। সে সময় ভুয়া বা প্রকৃত চাহিদাবিহীন চাকরির আবেদনের অভিযোগে কয়েক হাজার বাংলাদেশি কর্মীর ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। এর আগে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সৌদিমুখী কর্মী পাঠানোর গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ওই মাসে বাংলাদেশ থেকে মোট ৬২ হাজার ৪৩৬ জন কর্মী বিদেশে যায়, যা জানুয়ারির তুলনায় ৩৬ শতাংশ কম।
আবার মার্চে আটকে থাকা ভিসা ছাড়পত্রের কারণে কর্মী পাঠানো বেড়ে যায়। ওই মাসে সৌদি আরব একাই বাংলাদেশের মোট বিদেশগামী কর্মীর প্রায় ৭৭ শতাংশ গ্রহণ করে। একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার চিত্রই বাংলাদেশের শ্রমবাজার সংবেদনশীলতা ফুটিয়ে তুলছে। এজন্য বিকল্প বাজার খোঁজার তাগিদ দিচ্ছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। সরকারও নতুন বাজারে প্রবেশের কথা বলছে। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপের বিভিন্ন দেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের দেশগুলোর সঙ্গে কর্মী নিয়োগসংক্রান্ত চুক্তি বা সমঝোতা নিয়ে কাজ চলছে। তবে এ ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ কর্মীদের ভাষাগত ও কারিগরি দক্ষতা।
২০২৫ সালে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ৪৩ দশমিক ৪৭ শতাংশ ছিল কম দক্ষ, ৩৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ আধা-দক্ষ, ১৯ দশমিক ১৩ শতাংশ দক্ষ এবং মাত্র ২ দশমিক ৯৪ শতাংশ পেশাজীবী। অর্থাৎ মোট কর্মীর ৭৭ শতাংশ কম দক্ষ বা আধা-দক্ষ। এসব কর্মীর বড় অংশ এখনো নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, গৃহস্থালি, ডেলিভারি, সাধারণ শ্রমিকসহ তুলনামূলক কম মজুরির কাজে বেশি নিয়োজিত। বিপরীতে ইউরোপ ও অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির দেশে স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, কারিগরি পেশা, নির্মাণের বিশেষায়িত কাজসহ দক্ষ কর্মীর চাহিদা বেশি। ফলে বাংলাদেশ সেসব বাজারে প্রয়োজনীয় মাত্রায় প্রবেশ করতে পারছে না।
বৈদেশিক কর্মসংস্থানের এই চিত্রকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন অভিবাসনসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, একটি দেশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কর্মী রপ্তানির পুরো কাঠামোকেই হুমকির মুখে ফেলছে। এজন্য নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, দ্বিপক্ষীয় শ্রমচুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা প্রশিক্ষণ, অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিচ্ছেন তারা।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, শ্রমবাজারে একক দেশের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত ক্ষতিকর। বিশ্বের অনেক দেশেই বাংলাদেশি কর্মীর চাহিদা রয়েছে। জাপান, মালয়েশিয়াসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। আমাদের এখন বাজার অনুসন্ধান করতে হবে। পাশাপাশি যেসব দেশে কর্মী চাহিদা রয়েছে সেসব দেশের সার্ভিস সেন্টার কিংবা কনস্যুলেট অফিস ঢাকায় স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।
